দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

চীন ২০২০ সাল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলো দ্রুত সম্প্রসারণ করছে— যার ফলে দেশটির সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন এক অস্ত্র প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সিএনএনের বিশ্লেষণে স্যাটেলাইট ছবি, মানচিত্র ও সরকারি নথি যাচাই করে এই তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বা চীনা সেনাবাহিনীর রকেট বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কিত ১৩৬টি স্থাপনার মধ্যে ৬০ শতাংশেরও বেশি জায়গায় সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এসব স্থাপনা—যার মধ্যে কারখানা, গবেষণাগার ও পরীক্ষাকেন্দ্র রয়েছে—২০২০ সালের শুরু থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত ২১ লাখ বর্গমিটার নতুন ভবন নির্মাণ করেছে। উপগ্রহচিত্রে এসব এলাকায় নতুন টাওয়ার, বাঙ্কার, অস্ত্র সংরক্ষণ বেষ্টনী ও ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশও দেখা গেছে।
ন্যাটোর সাবেক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ পরিচালক ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ফোরামের সিনিয়র ফেলো উইলিয়াম আলবারকে বলেন, ‘চীন এখন নিজেকে বৈশ্বিক সুপারপাওয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। আমরা এক নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার শুরুতে রয়েছি। চীন ইতোমধ্যে দৌড় শুরু করেছে এবং দীর্ঘ প্রস্তুতি নিচ্ছে।’
সিএনএনের প্রতিবেদন বলছে, কয়েকটি উৎপাদন কেন্দ্র এত দ্রুত গড়ে উঠেছে যে সেগুলো আশপাশের গ্রাম ও কৃষিজমি দখল করে ফেলেছে। অনেক স্থাপনা গত পাঁচ বছরে কয়েক হাজার বর্গফুট পর্যন্ত বেড়েছে। এসব কেন্দ্রের অধিকাংশ চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের অধীনে।
২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সেনাবাহিনী আধুনিকায়নে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। লক্ষ্য— চীনের গণমুক্তি সেনাবাহিনীকে (পিএলএ) ‘বিশ্বমানের বাহিনী’ হিসেবে গড়ে তোলা। তিনি রকেট বাহিনীকেও (পিএলএআরএফ) সম্প্রসারণ করেছেন, যা এখন দেশের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার মূল নিয়ন্ত্রক।
চীনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কারখানাগুলো প্রায় সব সামরিক শাখায় সরবরাহ দেয়। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনী হিসেবে পিএলএর সক্রিয় সদস্য সংখ্যা দুই মিলিয়নেরও বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের (পেন্টাগন) হিসাবে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চীনের রকেট বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালে চীনের প্রতিরক্ষা বাজেটও ৭.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে— যা টানা চতুর্থ বছর ৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধির রেকর্ড।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইউক্রেন ও ইসরায়েলে প্রতিরক্ষা সহায়তায় বিপুল অস্ত্র পাঠাচ্ছে, ফলে নিজস্ব গোলাবারুদের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জুলাইয়ে সিএনএন জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে রক্ষায় ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রায় ২৫ শতাংশ মজুদ ব্যবহার করেছে।
অন্যদিকে, স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) জানিয়েছে, চীন ২০২৩ সাল থেকে প্রতিবছর প্রায় ১০০টি নতুন পারমাণবিক ওয়ারহেড যুক্ত করছে, যদিও মোট সংখ্যা এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার তুলনায় অনেক কম।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, চীনের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো তাইওয়ান আক্রমণের প্রস্তুতি। এসব ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীকে চীনের উপকূল থেকে দূরে রাখতে ‘অ্যান্টি-অ্যাকসেস ডিনায়াল বাবল’ তৈরি করবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সহায়তায় এগোতে নিরুৎসাহিত হয়।
বিশ্লেষক ডেকার ইভেলেথ বলেন, ‘চীনের লক্ষ্য হলো তাইওয়ান দখলের প্রস্তুতি নেওয়া— বন্দর, সরবরাহ ঘাঁটি ও হেলিকপ্টার বেসে হামলা চালানো, যাতে সাহায্য পৌঁছানো সম্ভব না হয়।’
রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর চীন ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের হার প্রায় দ্বিগুণ করেছে বলে সিএনএনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া যেভাবে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, চীন সেখান থেকে শিক্ষা নিচ্ছে।
তবে চীনের সেনাবাহিনীর ভেতরে দুর্নীতি ও নেতৃত্ব সংকটও রয়েছে। গত দুই বছরে রকেট বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব পরিবর্তন দেখায় যে চীন এখন কেবল সামরিক আধিপত্য নয়, বরং প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বের দৌড়েও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে।
সূত্র: সিএনএন
এমএস/