দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

দক্ষিণ কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার পাহাড়ি পর্যটনস্থল পাহেলগামের বৈসারণ উপত্যকায় মঙ্গলবারের সন্ত্রাসী হামলায় যখন আতঙ্কে পর্যটকেরা ছুটোছুটি করছিলেন, তখন এক ব্যক্তি নিজের জীবন তুচ্ছ করে দাঁড়িয়ে পড়েন মৃত্যুর সামনে-অন্যের জন্য। তিনি ছিলেন সৈয়দ আদিল হুসেন শাহ। তিনি ২৮ বছর বয়সী এক মুসলিম ঘোড়সওয়ার। তার এই আত্মত্যাগ আজ কাশ্মীর ও দেশের মানুষের কাছে একতার, সাহসিকতার ও মানবতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
হামলার সময় আদিল একটি অমুসলিম পর্যটক পরিবারকে বৈসারণে ঘোড়ায় চড়িয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন। সন্ত্রাসীরা যখন ধর্ম জেনে মানুষকে নিশানা করছিল, তখন তিনি ভয়ে পালানোর পরিবর্তে এক সন্ত্রাসীর দিকে ছুটে যান এবং তার অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এই মুহূর্তের বিভ্রান্তির মধ্যে পর্যটকরা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান।
তবে আদিল সফল হননি। সন্ত্রাসীরা তাকে ঘটনাস্থলেই গুলি করে হত্যা করে। কিন্তু তার সেই সাহসিক মুহূর্ত বহু জীবন রক্ষা করে দেয়। আজ কাশ্মীরের গণ্ডি ছাড়িয়ে তার বীরত্বের গল্প ছড়িয়ে পড়ছে-একটি ধর্ম নয়, মানবতার গল্প হিসেবে।
ফোনে ডেকাল হেরাল্ডকে আরও এক ঘোড়সওয়ার বলেন, ‘তিনি একবারও চিন্তা করেনি। তিনি পর্যটকদের দিকে বন্দুক তাক করতে দেখে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। তিনি নিজের জীবন দিয়ে দিলেন, তাদের রক্ষা করার জন্য, যাদের সে মাত্রই চিনেছিল।’
ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় আদিলের, কিন্তু তার কর্ম আজ অবিনাশী—সহানুভূতি, ঐক্য ও ঘৃণার বিরুদ্ধে সাহসের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তার মৃত্যুতে পরিবার শোকস্তব্ধ, ন্যায়বিচারের দাবিতে কাঁদছে।
তার মা, দরজার পাশে বসে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘সে ছিল আমাদের পরিবারের প্রাণ। ঘরের জন্য রোজগার করত, আমাদের দেখাশোনা করত, সম্মানের সঙ্গে জীবন যাপন করত।’ তার কণ্ঠ কাঁপছিল। এখন সে নেই। আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু সে একটি মহৎ কাজ করতে গিয়েই প্রাণ দিয়েছে… আমি চিরকাল গর্বিত থাকব তার জন্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওই একটা ছেলেই ছিল আমাদের সম্বল। ঘোড়ায় চড়িয়ে রোজগার করত। এখন আর কেউ নেই আমাদের দেখার। আমরা জানি না কীভাবে বাঁচব তার অভাবে।’
সংঘাতের দাগে চিহ্নিত এই উপত্যকায় আদিলের গল্প মনে করিয়ে দেয়-মানবতা ধর্মের ঊর্ধ্বে। তার মৃত্যু স্থানীয় ও পর্যটক সকলের মন ছুঁয়ে গেছে-শোক ও শ্রদ্ধার মাধ্যমে।
স্থানীয় দোকানদার ও আদিলের শৈশববন্ধু ইমতিয়াজ লোন বলেন, ‘তিনি কোনো রাজনৈতিক আদর্শের জন্য নয়, মানবতার জন্য প্রাণ দিয়েছেন। যখন সন্ত্রাসীরা আমাদের মধ্যে বিভেদ আনতে এসেছিল, তখন আদিল ভালোবাসা নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি শুধু মানুষ বাঁচাননি-আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তুলেছে। সেই মুহূর্তে সে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে যে ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং মানবতা কোনো ধর্মের সীমায় আবদ্ধ নয়।’
জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ আদিলের শেষকৃত্যে উপস্থিত ছিলেন এবং পরিবারকে সর্বতোভাবে সাহায্যের আশ্বাস দেন।
তিনি বলেন, ‘আদিল যে সাহস দেখিয়েছেন, তা অনন্য। আমরা তার পরিবারের পাশে আছি এবং সর্বপ্রকার সহযোগিতা করব।’
কাশ্মীরের মাটিতে ঘৃণা ছড়াতে চেয়েছিল সন্ত্রাসীরা, কিন্তু একজন সাধারণ ঘোড়সওয়ারের সাহসিকতা আমাদের মনে করিয়ে দিল-মানবতা ঘৃণার চেয়ে বড়, এবং ভালোবাসা অপরিচিতদের জন্যও বিসর্জন দিতে পারে। সৈয়দ আদিল হুসেন শাহ-এর গল্প যুগে যুগে কাশ্মীরের গর্ব হিসেবে থেকে যাবে।
কে