দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডানপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে চতুর্থবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন বামপন্থি নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা।
লুলা পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ ভোট। ১৯৮৫ সালে ব্রাজিলে বেসামরিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর তিনিই প্রথম প্রেসিডেন্ট, যিনি প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত হলেন।
বিজয়ের পর উল্লসিত সমর্থকদের উদ্দেশে লুলা বলেন, তাঁর এই জয় ‘নেতিবাচকতা ও মিথ্যার পরাজয়’। এ সময় তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক।’
তবে ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ফ্লাভিও বলসোনারো। সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও নির্বাচনের ফল বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা লুলাকে পুনর্নির্বাচিত হওয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছেন।
পর্যবেক্ষকদের কাছে বলসোনারোর ফল প্রত্যাখ্যানের অবস্থান অবশ্য অপ্রত্যাশিত নয়। তাঁর বাবা জইর বলসোনারোও এর আগে একই ধরনের অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে এবারের ফল চ্যালেঞ্জ করে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে।
নির্বাচনের ফল নিয়ে আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ক্রিস্তিয়ানো জানিনের দেশজুড়ে ভোট গ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত। লুলার সাবেক আইনজীবী হওয়ায় জানিনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বলসোনারোর কিছু সমর্থক।
তবে গণপরিবহন-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে লুলার দল কয়েকটি রাজ্যে ভোটের সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানালেও বলসোনারোর প্রচারশিবিরও ১৭টি এলাকায় সময় বাড়ানোর আবেদন করেছিল। দুই পক্ষই জানত, প্রতিটি ভোট গুরুত্বপূর্ণ; তাই নিজেদের সমর্থকদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে চেয়েছিল তারা।
সুপ্রিম ইলেকটোরাল কোর্টের প্রেসিডেন্ট কাসিও নুনেস মার্কেস লুলার বিজয় নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানোর কারণে নির্বাচনের ফল পরিবর্তিত হয়নি। উল্লেখ্য, মার্কেসকে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন ফ্লাভিওর বাবা জইর বলসোনারো।
দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান প্রায় ৪৪ লাখ হওয়ায় ফল চ্যালেঞ্জ করাও কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে। গত ৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ভোটে ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন বলসোনারো। সেবার লুলা পেয়েছিলেন ৪৫ শতাংশ ভোট।
প্রথম দফার ফলের পর বলসোনারো শিবির বিজয় উদ্যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফল বাতিলের দাবি জানিয়ে বলসোনারো একে ‘ব্যাখ্যাতীত’ বলে মন্তব্য করেন।
নির্বাচনের আগে লুলার শিবির ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর ওপর জোর দেয়। প্রথম দফায় প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ ভোটার ভোট দেননি। দ্বিতীয় দফায় অনুপস্থিত ভোটারের হার কমেছে ১৯৮৯ সালের পর কোনো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দুই দফার মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণে।
রোববার ফল ঘোষণার পর ব্রাসিলিয়ায় বলসোনারোর সমর্থকেরা তাঁর নির্বাচনী ফল দেখার স্থান থেকে হতাশ হয়ে চলে যান। অন্যদিকে, সাও পাওলোতে রাস্তায় নেমে সমর্থকদের সঙ্গে বিজয় উদ্যাপন করেন লুলা।
সাবেক ধাতুশ্রমিক লুলা বলেন, ‘আমার চতুর্থ মেয়াদ হবে এই দেশের ইতিহাসে যেকোনো প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে ভালো মেয়াদ। এ মেয়াদে আমি ব্রাজিলের মানুষের কথা সবচেয়ে বেশি শুনব।’
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরালদো আলকমিন তাঁকে বলেন, ‘আপনি দ্বিতীয়বারের মতো ব্রাজিলের গণতন্ত্রকে রক্ষা করলেন।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্ন অবস্থানে থাকা বিভিন্ন দেশের নেতারা লুলাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
মেক্সিকোর বামপন্থি প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ব্রাজিলের জনগণ জয়ী হয়েছে।’
পেরুর ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট কেইকো ফুজিমোরি ব্রাজিলের ‘গণতান্ত্রিক দিনটির’ প্রশংসা করেছেন। ট্রাম্পের মিত্র চিলি ও ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্টরাও একই ধরনের অভিনন্দনবার্তা দিয়েছেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, দুই দেশের অংশীদারত্ব ইতোমধ্যে তাদের ‘সমৃদ্ধ করেছে’। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেন, ‘গণতন্ত্র ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা’ জয়ী হয়েছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ লুলার বিজয়কে ‘বড় জয়’ হিসেবে অভিহিত করেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেন, আরও ন্যায়সংগত বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে দুই দেশের কাজ করা উচিত। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা লুলার বিজয়কে ‘বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলো এবং বিশ্বজুড়ে প্রগতিশীল শক্তির’ বিজয় বলে উল্লেখ করেন।
মঙ্গলবার ৮১ বছরে পা দিতে যাওয়া লুলা এর আগে তিন মেয়াদে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০০৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আবার প্রেসিডেন্ট হন তিনি।
এবারের জয়ের মধ্য দিয়ে ব্রাজিলের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চতুর্থ মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার রেকর্ড গড়লেন লুলা। তাঁর নতুন মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত চলবে।
তবে এবারের নির্বাচনী প্রচার ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। আগামী ৫ জানুয়ারি শুরু হতে যাওয়া নতুন মেয়াদে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—দুই ক্ষেত্রেই নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হবে লুলাকে। এর মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, যাঁর সঙ্গে লুলার সম্পর্ক বৈরী।
ট্রাম্পের কথিত ‘ডনরো ডকট্রিন’-এর প্রসঙ্গ টেনে লুলা তাঁর বিজয় ভাষণে বলেন, এই নীতি পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। তবে ব্রাজিল ‘কারও পেছনের উঠান’ হয়ে থাকতে রাজি নয় বলে স্পষ্ট করেন তিনি।
এর আগে ট্রাম্প জইর বলসোনারোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে হেরে যাওয়ার পর অভ্যুত্থানচেষ্টার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে বর্তমানে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো। এ বছরের শুরুর দিকে ফ্লাভিও বলসোনারো হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেন।
লুলার এই জয় লাতিন আমেরিকার বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতারও ব্যতিক্রম। আর্জেন্টিনা, চিলি ও কলম্বিয়ার মতো দেশগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে ভোটাররা ডানপন্থি প্রার্থী ও দলগুলোকে ক্ষমতায় এনেছেন।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/