দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরানে আবারও সামরিক অভিযান শুরু করার নির্দেশ দিলে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারের সবচেয়ে বড় অ-পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
‘মাদার অব অল বম্বস’ নামে পরিচিত এই বোমার আনুষ্ঠানিক নাম জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি)। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অস্ত্র ব্যবহার করা হলে ইরানে চলমান সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে। তবে এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
মার্কিন সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তাদের বরাতে সিএনএন ও আল জাজিরা জানিয়েছে, এই বোমা ব্যবহারের কার্যকারিতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের ভেতরেও উদ্বেগ রয়েছে। কারণ, অস্ত্রটি ব্যবহার করলেই ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংসের মতো ঘোষিত লক্ষ্য অর্জিত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ব্রাসেলসভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক এলিয়াহ ম্যাগনিয়েরের মতে, ইরানের গভীরে অবস্থিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলো ধ্বংস করার নিশ্চয়তা এই বোমা দিতে পারে না। এমন হামলা সামরিক কৌশলের চেয়ে রাজনৈতিক প্রদর্শনীতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
কী এই ‘মাদার অব অল বম্বস’?
জিবিইউ-৪৩/বি এমওএবি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বিশাল আকারের প্রচলিত বিস্ফোরক বোমা। এতে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কেজি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক থাকে। বোমাটির মোট ওজন প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কেজি, যা প্রায় চারটি ব্যক্তিগত গাড়ির ওজনের সমান। এর দৈর্ঘ্য ৯ মিটারের কিছু বেশি।
বিশাল আকারের কারণে বোমাটি সাধারণত লকহিড সি-১৩০ হারকিউলিস সামরিক পরিবহন বিমান থেকে নিক্ষেপ করা হয়। এটি গোপনীয়ভাবে অভিযান পরিচালনায় সক্ষম বোমারু বিমানে বহন করা যায় না।
২০০২ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে বোমাটি প্রথম তৈরি করা হয়। এর কার্যকারিতা যাচাই করতে ১২টি বিস্ফোরণ পরীক্ষা চালানো হয়েছে।
বোমাটির নামের সঙ্গে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের একটি ঐতিহাসিক ঘটনার যোগ রয়েছে। ওই সময় ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ‘মাদার অব অল ব্যাটলস’ কথাটি ব্যবহার করেছিলেন। সেখান থেকেই বোমাটির পরিচিত নামের উৎপত্তি।
যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত মাত্র একবার যুদ্ধে এই বোমা ব্যবহার করেছে। ২০১৭ সালে আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রদেশের যোদ্ধাদের ব্যবহৃত গুহা ও সুড়ঙ্গের একটি জটিল নেটওয়ার্কে হামলা চালাতে এটি নিক্ষেপ করা হয়েছিল।
আফগান কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই বিস্ফোরণে ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রদেশের ৯৪ জন যোদ্ধা নিহত হন এবং কোনো বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়নি। তবে স্থানীয় পর্যায়ে বেসামরিক মানুষের হতাহতের বিষয়ে কিছু অসমর্থিত খবর পাওয়া গিয়েছিল। বিস্ফোরণে বহু বাড়িঘরও ধ্বংস হয়।
কতটা বিধ্বংসী এই বোমা?
ভূমি থেকে কয়েক ফুট ওপরে বিস্ফোরণের জন্য তৈরি এমওএবি বিস্ফোরণের সময় প্রচণ্ড চাপ ও তাপের ঢেউ সৃষ্টি করে। এতে ভবন, গুহার প্রবেশপথ এবং শক্ত কাঠামো ধ্বংস হতে পারে।
সামরিক বিশ্লেষক ম্যাগনিয়েরের ভাষ্য, বিস্তৃত এলাকায় অত্যন্ত শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটানোই এই বোমার মূল উদ্দেশ্য।
সামরিক বিশেষজ্ঞ কর্নেল নিদাল আবু জেইদ বলেন, বিস্ফোরণের জন্য বোমাটিকে সরাসরি কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে হয় না। এর ব্যাপক বিস্ফোরণক্ষমতা ভূমির ওপরের প্রায় এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকার সবকিছু ধ্বংস করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের স্থলবাহিনীর অবস্থান ও ভূমির ওপরের সামরিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করতে এই বোমা ব্যবহারের কথা ভাবতে পারে। একই সঙ্গে দেশটির ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতেও আঘাত হানার লক্ষ্য থাকতে পারে। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের ভূগর্ভস্থ স্থাপনা, যেটিতে হামলার হুমকি আগেও দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তবে বোমাটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভূপ্রকৃতি ও জনবসতির ওপর। গভীর ভূগর্ভে থাকা স্থাপনা ধ্বংসের ক্ষেত্রে এটি খুব কার্যকর নাও হতে পারে বলে মনে করেন ম্যাগনিয়ের।
ইরানের ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনা এবং নির্মাণাধীন পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন স্থাপনার মতো কয়েকটি সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু গভীর ভূগর্ভে অবস্থিত এবং শক্তিশালী সুরক্ষাব্যবস্থায় ঘেরা।
ম্যাগনিয়ের বলেন, বোমাটির বিপুল বিস্ফোরণক্ষমতা ভূমির ওপর থাকা সেনা, সামরিক সরঞ্জাম ও দুর্বল কাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। আফগানিস্তানে এর ব্যবহার গুহা ও সুড়ঙ্গের অবস্থানে হামলার সক্ষমতা দেখিয়েছে, কিন্তু সব ধরনের ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংস করার ক্ষমতা প্রমাণ করেনি।
গভীর কংক্রিট কিংবা পাহাড়ের পাথর ভেদ করে ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য এমওএবি বিশেষভাবে তৈরি নয়। এ ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আরও শক্তিশালী একটি অস্ত্র রয়েছে। সেটি হলো জিবিইউ-৫৭ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর।
এই বোমার ওজন প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ কেজি এবং এতে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কেজি বিস্ফোরক থাকে। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইস্পাত দিয়ে তৈরি এই নির্ভুল নিশানার বোমাটি বিস্ফোরণের আগে প্রায় ৬১ মিটার গভীর পর্যন্ত মাটির নিচে প্রবেশ করতে পারে।
ইরানে কি সত্যিই ব্যবহার করবে যুক্তরাষ্ট্র?
আফগানিস্তানে ২০১৭ সালে এমওএবি ব্যবহারের নজির থাকলেও ইরানে একই ধরনের হামলা চালানো সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইরানের যেসব এলাকায় পারমাণবিক স্থাপনাগুলো রয়েছে, সেখানে প্রয়োজনীয় পরিবহন বিমান নিয়ে যাওয়া কঠিন হতে পারে। গোপনীয়ভাবে অভিযান পরিচালনায় সক্ষম বোমারু বিমানগুলোও এই আকারের বোমা বহন করতে পারে না।
ম্যাগনিয়েরের মতে, এমওএবি ব্যবহার করে অবকাঠামো ধ্বংস করা সম্ভব হলেও এতে ইরানকে কোনো ছাড় দিতে বাধ্য করা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং বিশাল বিস্ফোরণের দৃশ্য তৈরি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, অন্য কোনো অস্ত্র দিয়ে যে কাজ করা সম্ভব নয়, এই বোমা ব্যবহারে অতিরিক্ত কী অর্জন হবে এবং তা কীভাবে একটি বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করবে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত আলোচনায় ট্রাম্প এমন একটি চূড়ান্ত পরিণতি খুঁজছেন, যা প্রমাণ করবে যে ওয়াশিংটন যুদ্ধে পরাজিত হয়নি।
হামলা হলে কী করতে পারে ইরান?
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র এমওএবি ব্যবহার করে হামলা চালালে ইরান বড় ধরনের পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এমনকি যেসব প্রতিবেশী দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনা রয়েছে, সেসব দেশে অভিযান চালানোর ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরে কুয়েতের মতো দেশে অভিযান চালিয়ে মার্কিন সেনাদের আটক করার সম্ভাবনা নিয়ে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। তাদের ধারণা, এভাবে মার্কিন সেনাদের আটক করা গেলে ওয়াশিংটনকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব হতে পারে।
মে মাসে সংঘাতের মধ্যে সাময়িক বিরতির সময় কুয়েত অভিযোগ করে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কয়েকজন সদস্য দেশটির বুবিয়ান দ্বীপে অনুপ্রবেশ করেছিলেন। এ ঘটনায় ইরানি ও কুয়েতি বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি হয়। এতে একজন কুয়েতি আহত হন এবং চারজন ইরানি সেনা আটক হন।
তবে ইরান দ্বীপটিতে অনুপ্রবেশের অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, তাদের সেনাদের দিকনির্দেশনা ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিয়েছিল।
মঙ্গলবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মোহাম্মদ রেজা নাঘদি সতর্ক করে বলেন, ওয়াশিংটন স্থল অভিযান শুরু করলে ইরান মার্কিন সেনাদের আটক করতে পারে। যদিও ইরানের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে দেশটিতে স্থল অভিযান চালানোর বিষয়ে ট্রাম্পের আগের হুমকিগুলোকে সামরিক বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই অবাস্তব বলে মনে করে আসছেন।
নাঘদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র স্থল হামলা চালালে এত বেশি মার্কিন সেনা আটক করা হবে যে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকে সাদা পতাকা তুলতে বাধ্য হতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান নতুন করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ জন্য দেশটি অস্ত্রের মজুত বাড়াচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ও প্রতিরক্ষা স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা জোরদার করছে এবং নিজেদের সমর্থকদের সংগঠিত করছে।
রোববার টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজাই হুমকি দেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা শুরু করলে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর ডিজিটাল অবকাঠামোতে আঘাত হানতে পারে তেহরান। এসব অবকাঠামোর মধ্যে যোগাযোগের তার, তথ্যকেন্দ্র ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক স্থাপনাও রয়েছে।
/অ