দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ বা অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন দিল্লির যন্তর মন্তরের উদ্দেশে মিছিল করার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও কয়েকটি ছাত্রসংগঠন। ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়ম, ভোট চুরি এবং ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের যোগসাজশের অভিযোগ তুলে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে তারা। শনিবার দিল্লিতে ব্যাপক ধরপাকড়ের পরও পিছু না হটার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
সিজেপির নেতা অজিঙ্ক শিন্ডে আগামীকাল রোববার আবার যন্তর মন্তরের উদ্দেশে মিছিল করার ঘোষণা দিয়েছেন। দলটির ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্টে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, মোদি সরকার ভয় পাচ্ছে। আন্দোলনকারীরা আবার একজোট হলে সরকারের ক্ষমতার ভিত নড়ে যেতে পারে। সব দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলেও জানান তিনি। পোস্টে একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও বার্তাও যুক্ত করা হয়।
শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের অভিযানে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেসহ দলটির শীর্ষ নেতারা এবং শত শত বিক্ষোভকারী আটক হন। জাতীয় রাজধানীর কেন্দ্রস্থল যন্তর মন্তরে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল সিজেপি। তবে সেখানে বিক্ষোভের অনুমতি না থাকায় পুলিশ অভিযান চালায়। আটক বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্যাতন চালানোর অভিযোগও করেছে সংগঠনটি।
সিজেপির নেতারা জানান, শনিবার সকাল ১১টার দিকে দিল্লিতে উড়োজাহাজ অবতরণের পরপরই অভিজিৎ দীপকেকে আটক করে পুলিশ। এরপর তাঁকে ও অন্য নেতাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন ছিলেন। দীপকের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, মহারাষ্ট্রে তাঁর নিজ শহরে দাদি মারা গেলেও তাঁকে শেষকৃত্যে অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না।
দীপকের অনুপস্থিতিতে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া সিজেপি নেতা অজিঙ্ক শিন্ডে বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে জ্ঞানেশ কুমারকে সরানো না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন যন্তর মন্তরের উদ্দেশে মিছিল হবে।
ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের (এসএফআই) সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, রোববার থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়বে। তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করবেন। পুলিশ যেখানে বাধা দেবে, সেই জায়গাকেই যন্তর মন্তরে পরিণত করা হবে।
এদিকে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ সোমবার বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী জানিয়েছেন, ওই দিন জোটের নেতারা সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে দেখা করে একটি স্মারকলিপি দেবেন।
এর আগে শুক্রবার রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে চার দফা দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি দেয় বিরোধী জোটটি। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের দায়মুক্তি দেওয়া ২০২৩ সালের আইন বাতিল, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) কার্যক্রম স্থগিত এবং বাদ পড়া ১৩ কোটি ৩০ লাখ ভোটারের নাম পুনর্বহাল। এ ছাড়া সব নির্বাচনে কাগজের ব্যালট ফিরিয়ে আনা এবং গত দুই বছরে যেসব বিধানসভা নির্বাচনে ভোট চুরির অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে, সেগুলো বাতিলের দাবিও জানিয়েছে জোটটি।
শনিবার দিল্লিজুড়ে এক হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করে পুলিশ। যন্তর মন্তরে সমাবেশ ঠেকাতে অনুমতি না থাকার কথা জানিয়ে এ অভিযান চালানো হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বামপন্থী নেতা পিনারাই বিজয়ন ও মানিক সরকার।
অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে সিজেপির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকেও আটক করা হয়। দীপক পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় মহারাষ্ট্রে তাঁর পিতামহী মারা যান। পুলিশ জানিয়েছে, শেষকৃত্যে যোগ দিতে তাঁকে চলে যেতে বলা হয়েছিল। তবে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আন্দোলন ঘিরে দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর অন্তত ২৫ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়। দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশনের প্রবেশপথ বন্ধ রাখা হয় এবং ২৫০টির বেশি ট্রেন বাতিল করা হয়। যন্তর মন্তরের চার কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ রাখা হয়। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, নারী ও প্রবীণদের আগে মুক্তি দেওয়া হচ্ছিল। রোববারও নিরাপত্তা মোতায়েন অব্যাহত থাকবে।
চেন্নাইয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে থাকা রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, সব নেতা ও তরুণকে আটক করা হলেও আন্দোলনকারীরা পিছু হটবেন না। ভারতের তরুণদের প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
আটক হওয়ার আগে কেজরিওয়াল বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, মোদি সরকার যেখানে বাধা দেবে, সেখানেই বসে পড়তে হবে এবং সেই জায়গাকেই যন্তর মন্তরে পরিণত করতে হবে। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, পরিস্থিতি জরুরি অবস্থাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তাঁর ভাষায়, এটি এখন ‘সুপার ইমার্জেন্সি’ বা চরম জরুরি অবস্থায় পরিণত হয়েছে।
তবে বিজেপির মুখপাত্র রবিশঙ্কর প্রসাদ জ্ঞানেশ কুমার ও ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ভারতের গণতন্ত্র অরাজকতা তৈরির চেষ্টা ঠেকিয়েছে। দেশ পরিচালিত হবে সংসদের মাধ্যমে, রাস্তায় আন্দোলনের মাধ্যমে নয়।
এদিকে মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দানে সিজেপির আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভ করায় প্রায় ২০০ জনকে আটক করে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী ও অভিনেতা ইমরান খানও ছিলেন। আহমেদাবাদ ও চেন্নাইসহ ভারতের আরও কয়েকটি শহরেও বিক্ষোভ ও আটকের ঘটনা ঘটেছে।
এমএস/