দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা বর্তমানে এমন এক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, যাকে কেউ কেউ কোভিড-১৯ মহামারির সময়ের সংকটের চেয়েও কঠিন বলে বর্ণনা করছেন। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থায় অস্থিরতা, শুল্ক, আবহাওয়াজনিত বাধা এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যবসা পরিচালনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নর্থ ক্যারোলাইনার র্যালিতে ডিলওয়ার্থ কফির প্রধান নির্বাহী জেফ ভজতা বলেন, ২০২৪ সালে ব্রাজিলে কফির দুর্বল ফলনের কারণে কফির দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায়। পরের বছর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক নীতির কারণে দাম আরও বাড়ে। চলতি বছরে ইরান যুদ্ধ, পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্ন, কনটেইনার সংকট এবং সারসহ বিভিন্ন উপকরণের বাড়তি খরচ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ভজতার ভাষায়, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন, কনটেইনারের সংকট, লোহিত সাগরের পরিস্থিতির কারণে বাড়তি পরিবহন ব্যয় এবং সারমূল্য বৃদ্ধির কারণে এমন এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা তারা আগে কখনো দেখেননি। ফলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তাও বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীদের একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার কথা উঠে এসেছে। চলতি মাসে ইনস্টিটিউট ফর সাপ্লাই ম্যানেজমেন্টের (আইএসএম) মাসিক জরিপে কয়েকজন ব্যবসায়ী বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে কোভিড মহামারির সময়ের তুলনা করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, কোভিডের সময়ের পরিস্থিতিও বর্তমান সময়ের তুলনায় তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল।
ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাপ্লাই চেইন কর্মসূচির পরিচালক জ্যাক বাফিংটন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কোভিডের সময়ের চেয়েও বড় সমস্যা। তার মতে, এবারের সংকটের বড় অংশই জ্বালানি-সংক্রান্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ইরান যুদ্ধকে সাময়িক অর্থনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম কমতে পারে। ট্রাম্পও এর আগে দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হলে তেলের দাম দ্রুত কমে যাবে।
তবে ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতা বলছে, বর্তমান সরবরাহব্যবস্থার সংকট শুধু ইরান যুদ্ধের কারণে তৈরি হয়নি। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের উচ্চহার ইতোমধ্যে অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও প্রভাব ফেলছে। খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাদ দিয়ে হিসাব করা মূল মূল্যস্ফীতিও গত মাসে এপ্রিলে পর সর্বোচ্চ হারে বেড়েছে। এর প্রভাব সেবা খাতের বাড়তি দামের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।
মার্চের পর থেকে ডিজেলের দাম দ্বিগুণ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পেছনে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধের পাশাপাশি রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের হামলাকেও দায়ী করা হচ্ছে। একই সময়ে আবহাওয়াজনিত নানা সমস্যার কারণে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম কনটেইনার বন্দর সাংহাইয়ে পরপর কয়েকটি টাইফুনের কারণে প্রায় দুই সপ্তাহ কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এতে পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের বিলম্ব তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে বৈশ্বিক সমুদ্রপথে সরবরাহের একটি বড় অংশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
লোহিত সাগরে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতা এবং এডেন উপসাগরে জলদস্যুদের ঝুঁকিও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চাপ বাড়াচ্ছে। হামলা এড়াতে অনেক জাহাজকে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে চলতে হচ্ছে। এতে চলতি বছর বৈশ্বিক নৌপরিবহন সক্ষমতা প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে বলে জানান লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান ফ্লেক্সপোর্টের প্রধান নির্বাহী রায়ান পিটারসেন।
পিটারসেন বলেন, ২৫ বছরের লজিস্টিকস অভিজ্ঞতায় তিনি এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখেননি।
কোভিড মহামারির সময়ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা কার্যত থমকে গিয়েছিল। কনটেইনারবাহী জাহাজগুলো বন্দরে ঢোকার জন্য সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করত। দোকানগুলোতে টয়লেট পেপার, মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি অবশ্য ভিন্ন। এখন সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ নয়; বরং কখনো স্বাভাবিক হচ্ছে, আবার কখনো নতুন বাধার কারণে পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। একইভাবে পণ্যের দামও কখনো কমছে, আবার দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
রোপ, কর্ড ও লিশ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান র্যাভেনক্সের প্রধান নির্বাহী শন ব্রাউনলি বলেন, কোভিডের সময়ের তুলনায় এখন সরবরাহব্যবস্থা বেশি খরচ, জটিলতা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে চলছে।
তিনি বলেন, ছোট ব্যবসাগুলো সাধারণত শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাড়তি খরচ নিজেরাই বহন করার চেষ্টা করে। কিন্তু এখন সেই চাপ তীব্র হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মেরিন কর্মকর্তা ব্রাউনলি মার্কিন কর্মসংস্থানকে সমর্থন করে এমন একটি উৎপাদন প্রতিষ্ঠান গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ব্যবসায় এসেছিলেন। কিন্তু সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা সেই স্বপ্নের ওপরও চাপ তৈরি করেছে।
ডিলওয়ার্থ কফির ভজতা বলেন, আগে তারা ১২ থেকে ২৪ মাস আগেই কফির উৎস নির্ধারণ করতেন। এখন পরিস্থিতির কারণে তিন থেকে ছয় মাসের বেশি আগাম পরিকল্পনা করা সম্ভব হচ্ছে না। আবহাওয়ার পরিবর্তন, বিশেষ করে চলতি বছরের সুপার এল নিনোর প্রভাব ভিয়েতনাম ও ব্রাজিলের কফি উৎপাদন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমিত নগদ অর্থ, বাড়তি পরিবহন ব্যয় এবং কমে যাওয়া মুনাফা। ফলে আগের মতো বেশি পরিমাণ কফি মজুতও করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রেতাদের অতিরিক্ত ব্যয় করার সক্ষমতাও কমেছে।
ভজতা জানান, আগে তাদের মাসিক বিক্রির পরিমাণ সাধারণত ৫ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করত। এখন তা ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে বা কমতে পারে। ডিজেলের দাম কতদিন ৬ ডলারের ওপরে থাকবে কিংবা বাড়তি খরচ কীভাবে গ্রাহকদের ওপর দেওয়া হবে—এসব প্রশ্নই এখন ব্যবসার প্রতিদিনের বাস্তবতা। তিনি বলেন, পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং, কারণ তাদের গ্রাহকরাও একই ধরনের অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছেন।
সূত্র: সিএনএন
এমএস/