দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

মাটি, ঘাস, গাছের বাকল কিংবা শ্যাওলা ছোঁয়া মানেই শুধু হাত ময়লা হওয়া নয়। গবেষণা বলছে, প্রকৃতির এসব উপাদানের সংস্পর্শ ত্বকে থাকা জীবাণুর বৈচিত্র্য বাড়াতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাতেও।
ফিনল্যান্ডের পরিবেশ ইনস্টিটিউটের পরিবেশবিদ ও প্রকৃতি-স্বাস্থ্য গবেষক মিরা গ্রোনরুসের এক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের ২০ সেকেন্ড ধরে মাটি, পিট ও শ্যাওলা হাতে ঘষতে বলা হয়। এরপর কলের পানিতে হাত ধুয়ে নেওয়ার পরও তাদের ত্বকে থাকা জীবাণুর সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বেড়ে যায়। বাইরে থেকে হাত পরিষ্কার দেখালেও ত্বকের জীবাণুসমাজে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়।
ত্বকে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু থাকা সবসময় ক্ষতিকর নয়। গবেষকদের মতে, বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবাণুসমাজ পরস্পরকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং ক্ষতিকর রোগজীবাণুর আধিপত্য ঠেকাতে সাহায্য করতে পারে। তাই মাটি ও উদ্ভিদের মতো প্রাকৃতিক উপাদানের সংস্পর্শ ত্বকের জীবাণুবৈচিত্র্য বাড়ানোর একটি সহজ উপায় হতে পারে।
তবে এই পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী নয়। গ্রোনরুসের পরীক্ষায় দেখা যায়, কিছু সময় পর ত্বকের জীবাণুসমাজ আবার আগের অবস্থার কাছাকাছি ফিরে যায়। তার মতে, প্রকৃতির সঙ্গে দীর্ঘ সময় বা নিয়মিত সংস্পর্শ শরীরের ত্বক ও ভেতরের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আরও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে।
শিশুদের ওপর করা গবেষণাতেও একই ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ফিনল্যান্ডের ৪৩টি শিশুযত্নকেন্দ্রের একটি গবেষণা প্রকল্পে শিশুদের প্রতিদিনের খেলার জায়গায় মাটি, কাঠের টুকরো, বালি ও গাছপালার মতো প্রাকৃতিক উপাদান রাখা হয়েছে। গবেষকেরা শিশুদের ত্বক, লালা, মল, রক্ত ও চুলের নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখছেন, প্রকৃতির সঙ্গে নিয়মিত সংস্পর্শে তাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কীভাবে বদলায়।
এর আগে ২০১৬-১৭ সালে করা এক গবেষণায় একটি শিশুযত্নকেন্দ্রের আঙিনায় বনভূমির মাটি, পিট ও গাছ লাগানোর বাক্স যুক্ত করা হয়েছিল। শিশুরা সেখানে নিয়মিত ২৮ দিন খেলার পর এবং এক বছর পর তাদের ত্বক, লালা ও অন্ত্রের জীবাণু পরীক্ষা করা হয়। পাকা আঙিনায় খেলা শিশুদের তুলনায় বনভূমির মাটিতে খেলা শিশুদের ত্বকে এক বছর পরও জীবাণুর বৈচিত্র্য বেশি ছিল।
গবেষক মারজা রসলান্ডের মতে, ত্বকে জীবাণুর বৈচিত্র্য বাড়লে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর আধিপত্য কমতে পারে। তার গবেষণায় বনভূমির মাটিতে খেলা শিশুদের ত্বকে সম্ভাব্য রোগজীবাণুও কম পাওয়া যায়। বৈচিত্র্যপূর্ণ অন্যান্য জীবাণুর সংখ্যা বেশি থাকায় ক্ষতিকর জীবাণুর জন্য জায়গা কমে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রকৃতির সংস্পর্শের প্রভাব শুধু ত্বকেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এক পরীক্ষায় শিশুদের একদলকে বেশি জীবাণুবৈচিত্র্যপূর্ণ মাটি দিয়ে তৈরি বালুর বাক্সে খেলতে দেওয়া হয়। অন্য দল খেলেছে কম জীবাণুবৈচিত্র্যপূর্ণ মাটির বালুর বাক্সে। বেশি জীবাণুবৈচিত্র্যপূর্ণ মাটিতে খেলা শিশুদের ত্বকে নির্দিষ্ট কিছু জীবাণুর বৈচিত্র্য বাড়ার পাশাপাশি রক্তে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক সাইটোকাইনেরও পরিবর্তন দেখা যায়।
প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর করা একটি গবেষণাতেও একই ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একদল মানুষ এক মাস বেশি জীবাণুবৈচিত্র্যপূর্ণ মাটি ব্যবহার করে ঘরের ভেতর সবজি চাষ করেন। তাদের ত্বকে জীবাণুর বৈচিত্র্য এবং রক্তে প্রদাহবিরোধী সাইটোকাইনের মাত্রা বাড়ে। কম জীবাণুবৈচিত্র্যপূর্ণ মাটি ব্যবহার করা অন্য দলের ক্ষেত্রে এমন পরিবর্তন দেখা যায়নি।
ফিনল্যান্ডের কয়েকটি অফিসে জীবন্ত উদ্ভিদ দিয়ে তৈরি ‘সবুজ দেয়াল’ স্থাপনের পরও কর্মীদের ত্বকে জীবাণুর বৈচিত্র্য বাড়তে এবং রক্তে প্রদাহ সৃষ্টিকারী সাইটোকাইনের মাত্রা কমতে দেখা গেছে। ত্বকে ল্যাক্টোব্যাসিলাস নামের জীবাণুরও বৃদ্ধি দেখা যায়, যা ত্বকের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে প্রকৃতির সংস্পর্শে এলেই হাঁপানি, অ্যালার্জি বা একজিমার মতো রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাসংশ্লিষ্ট সমস্যা প্রতিরোধ করা যাবে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো নেই। গবেষকদের মতে, এসব সমস্যার ঝুঁকি কমার সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিললেও এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষকদের ধারণা, শহর ও দৈনন্দিন জীবন এমনভাবে সাজানো উচিত, যাতে মানুষ ইচ্ছা করে আলাদা সময় বের না করেও নিয়মিত প্রকৃতির সংস্পর্শে আসতে পারে। মাটি, ঘাস, গাছপালা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ত্বকের জীবাণুবৈচিত্র্য ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে।
/অ