দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ফুসফুসের ক্যানসার বলতেই এতদিন ধূমপানের কথা সবার আগে মনে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই রোগের সঙ্গে ধূমপানের সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ যে, যারা কখনো সিগারেট খাননি, তাদের অনেকেই নিজেদের এ রোগের ঝুঁকির বাইরে মনে করেন। কিন্তু সেই ধারণা এখন আর পুরোপুরি ঠিক নয়।
ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কখনো ধূমপান করেননি। চিকিৎসকদের মতে, তাই ফুসফুসের ক্যানসারকে শুধু ধূমপায়ীদের রোগ হিসেবে দেখার সময় শেষ হয়ে আসছে।
আমৃতা হাসপাতাল, ফরিদাবাদের ফুসফুস রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক চিকিৎসক সৌরভ পাহুজা বলেন, ‘ফুসফুসের ক্যানসার মূলত ধূমপায়ীদের রোগ—এই ধারণা এখন পুরোনো হয়ে যাচ্ছে। আমরা এমন অনেক রোগী দেখছি, যারা কখনো ধূমপান করেননি। বিষয়টি কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না।’
ধূমপান না করেও আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে
ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের বড় একটি অংশকে ধূমপান না করা ব্যক্তি হিসেবে পাওয়া গেছে।
চিকিৎসক পাহুজার মতে, বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায় ৫০ শতাংশ রোগী ধূমপান করেন না—এমন যে সংখ্যা বলা হয়, সেটিকে কিছুটা প্রেক্ষাপটসহ দেখতে হবে। এটি পুরো ভারতের জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যান নয়। তবে কিছু হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্তদের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কখনো ধূমপান করেননি।
তার ভাষায়, এত বড় একটি অংশকে ব্যতিক্রম হিসেবে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ফলে ফুসফুসের ক্যানসারের কারণ হিসেবে শুধু তামাকের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না।
প্রতিদিনের বাতাসেও লুকিয়ে ঝুঁকি
ধূমপান না করা মানুষের ফুসফুসে ক্যানসারের অন্যতম বড় কারণ হতে পারে তারা প্রতিদিন যে বাতাস শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাতাসে থাকা অতিক্ষুদ্র কণিকা, বিশেষ করে পিএম ২ দশমিক ৫, ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘদিন এসব কণিকার সংস্পর্শে থাকলে ফুসফুসে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, অক্সিডেটিভ চাপ ও কোষের ক্ষতি হতে পারে। সময়ের সঙ্গে এসব পরিবর্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থাও বাইরের বায়ুদূষণকে প্রথম শ্রেণির ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে।
ভারতে দীর্ঘমেয়াদি বায়ুদূষণের উৎস হিসেবে যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার দূষণ, নির্মাণকাজের ধুলা এবং মৌসুমি ধোঁয়াশার কথা উল্লেখ করছেন বিশেষজ্ঞরা। আর এসব দূষণের সংস্পর্শ এক-দুই দিনের নয়—দশকের পর দশক ধরে শরীরে জমা হতে পারে এর প্রভাব।
ঘরের ভেতরেও বিপদ
ঝুঁকি শুধু বাইরের বাতাসে সীমাবদ্ধ নয়। ঘরের ভেতরের পরিবেশও ফুসফুসের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
কাঠ, খড় বা অন্যান্য জৈব জ্বালানি ব্যবহার করে রান্না করা, অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল এবং পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শ ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে অ্যাসবেস্টস, সিলিকা ও ডিজেল ইঞ্জিনের ধোঁয়ার মতো উপাদানের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শও ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়।
চিকিৎসক পাহুজা জানান, ভারতে ধূমপান না করা ব্যক্তিদের নিয়ে করা কিছু রোগী-নিয়ন্ত্রণ গবেষণায় উচ্চঝুঁকির পেশা, অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচলযুক্ত পরিবেশে জৈব জ্বালানি ব্যবহার এবং পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে ফুসফুসের ক্যানসারের শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
ধূমপান না করা রোগীদের ক্যানসারও আলাদা হতে পারে
ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত ধূমপান না করা ব্যক্তিদের রোগের জীববৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্যও অনেক সময় ভিন্ন হয়।
চিকিৎসক পাহুজার মতে, যারা কখনো ধূমপান করেননি, তাদের ফুসফুসের ক্যানসার প্রায়ই অ্যাডেনোকারসিনোমা ধরনের হয়। এ ধরনের রোগীর ক্যানসার কোষে কিছু নির্দিষ্ট আণবিক পরিবর্তনও দেখা যেতে পারে।
এর মধ্যে ইজিএফআর জিনের পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপান না করা রোগীদের মধ্যে ইজিএফআর পরিবর্তন প্রায় তিন গুণ বেশি হতে পারে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে চিকিৎসায়। কারণ ফুসফুসের ক্যানসারকে এখন আর একটি মাত্র রোগ হিসেবে দেখা হয় না। রোগীর ক্যানসার কোষের আণবিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা বেছে নেওয়া যায় এবং এর ওপর চিকিৎসার ফলাফলও নির্ভর করতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিপদ—রোগটি সন্দেহই না করা
ধূমপান না করা মানুষের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হলো রোগ সম্পর্কে ভুল ধারণা। নিজেকে ঝুঁকিমুক্ত মনে করায় অনেকে উপসর্গ দেখা দিলেও দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান না।
চিকিৎসক পাহুজা বলেন, সবচেয়ে বড় বিপদ হলো মানুষ নিজেকে ঝুঁকির মধ্যে মনে না করা। কোনো ব্যক্তি সারাজীবন ধূমপান না করলেও যদি দীর্ঘস্থায়ী কাশি, কারণ ছাড়া ওজন কমে যাওয়া, কাশির সঙ্গে রক্ত, বুকে ব্যথা কিংবা বারবার ফুসফুসের সংক্রমণের মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
দেরিতে চিকিৎসকের কাছে গেলে রোগ শনাক্ত হওয়ার সময় ক্যানসার আরও অগ্রসর পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে।
তাহলে করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধূমপান এখনো ফুসফুসের ক্যানসারের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকি। কিন্তু এটিই একমাত্র কারণ নয়।
বায়ুদূষণ, ঘরের ভেতরের দূষণ, কর্মক্ষেত্রে ক্ষতিকর উপাদানের সংস্পর্শ এবং জিনগত ঝুঁকির বিষয়গুলো নিয়েও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
চিকিৎসক পাহুজার মতে, উপসর্গ সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সময়মতো চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো রোগীর চিকিৎসার ফলাফলে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
ফুসফুসের ক্যানসার এখন আর শুধু ধূমপায়ীদের রোগ নয়—এই বাস্তবতাই সামনে আনতে চাইছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘আমি কখনো ধূমপান করিনি’—এই কথার অর্থ ‘আমি ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারি না’ নয়। বিশেষ করে ভারতে যেখানে পরিবেশগত নানা ক্ষতিকর উপাদানের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ রয়েছে, সেখানে ঝুঁকির বিষয়গুলো জানা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
/অ