দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস কাঞ্চন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে বর্তমানে লন্ডনে চিকিৎসাধীন থাকলেও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে দিবসটি উপলক্ষে সরকারের প্রতি এক বছরের সময়বদ্ধ ও পরিমাপযোগ্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
বুধবার (২১ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় তিনি এসব কথা বলেন।
বার্তায় ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ২২ অক্টোবর শুধু একটি দিবস নয়; এটি শোক, স্মৃতি, আন্দোলন এবং সড়কে মানুষের জীবন রক্ষার অঙ্গীকারের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, আহত ব্যক্তিদের কষ্ট এবং স্বজন হারানো পরিবারগুলোর বেদনা স্মরণ করার অর্থ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া ও প্রতিটি মানুষের জীবনের মূল্য নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে বর্তমানে লন্ডনে চিকিৎসাধীন থাকলেও তার মন পড়ে আছে দেশের মানুষের কাছে, নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের কাছে। অসুস্থতার সময়ে যাঁরা তাঁর খোঁজ নিয়েছেন, ভালোবাসা জানিয়েছেন এবং সুস্থতার জন্য দোয়া করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। একই সঙ্গে নিসচার নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সবার প্রতি ধন্যবাদ জানান।
নিসচার দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ১৯৯৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনকে হারানোর পর তিনি উপলব্ধি করেন, সড়কে একটি মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, পুরো সমাজের ক্ষতি। সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে মানুষের জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি নিরাপদ সড়ক চাই প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি বলেন, ১৯৯৪ সাল থেকে ২২ অক্টোবরকে নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে পালনের মাধ্যমে নিসচা নিরাপদ সড়কের দাবি জনপরিসরে তুলে ধরে। সংগঠনটির দীর্ঘ আন্দোলন ও দাবির ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে সরকার ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ঘোষণা করে।
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, এই ইতিহাস কোনো ব্যক্তির একার নয়; এটি সড়কে স্বজন হারানো মানুষ, নিসচার নিবেদিত কর্মী এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে সোচ্চার দেশবাসীর সম্মিলিত ইতিহাস। তাই নিসচাকে তার ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করা, এর অবদান আড়াল করা কিংবা ২২ অক্টোবরের তাৎপর্য মুছে ফেলা বা বিকৃত করার যেকোনো প্রচেষ্টা তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি আরও বলেন, ইতিহাস ও অবদান নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে তথ্য, নথি ও সত্যের ভিত্তিতে বক্তব্য দেওয়া উচিত। দীর্ঘদিনের আন্দোলন, ত্যাগ ও প্রামাণ্য ইতিহাসকে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে মুছে ফেলা যায় না।
সড়ক দুর্ঘটনার কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক সময় দুর্ঘটনাকে নিয়তি বা দুর্ভাগ্য বলে পাশ কাটানো হয়। অথচ অধিকাংশ দুর্ঘটনার পেছনে থাকে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা, চালকের ক্লান্তি বা অদক্ষতা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অনিরাপদ সড়ক, পথচারীদের নিরাপদে পারাপারের অভাব এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়ার মতো ঝুঁকি। এসব ঝুঁকি কমানো সম্ভব হলে বহু প্রাণ রক্ষা করা যাবে।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বাজারের কাছে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি দখলমুক্ত ফুটপাত, নিরাপদ পারাপার, পর্যাপ্ত সড়কবাতি ও স্পষ্ট নির্দেশক নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা কার্যকর করা, ত্রুটিপূর্ণ ব্রেক ও টায়ারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল পরিবহন বন্ধ করা এবং নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতি দূর করার ওপরও জোর দেন তিনি। চালকদের লাইসেন্স দেওয়ার আগে দক্ষতা যাচাই ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পেশাদার চালকদের কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের নিয়ম মানার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, দুর্ঘটনা কমাতে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব এবং সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। কোথায়, কখন ও কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে এবং কারা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক সংশোধন, বাজেট বরাদ্দ ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
দুর্ঘটনার পর শুধু দায়ী ব্যক্তিকে শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পেছনে সড়ক, যানবাহন, পরিবহন পরিচালনা ও তদারকির যেসব ত্রুটি রয়েছে, সেগুলোও তদন্ত করতে হবে।
নিসচার নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দেশে না থাকলেও সংগঠনের কার্যক্রম থেমে থাকবে না। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে নিসচার ইতিহাস ও আদর্শ ধারণ, তথ্যভিত্তিক বক্তব্য প্রদান এবং সড়ক নিরাপত্তার আন্দোলন আরও জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা এ আন্দোলন কোনো বিভ্রান্তি বা অপপ্রচারে থেমে যাবে না বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে সরকারের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, দিবস পালন যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। ২২ অক্টোবর থেকে পরবর্তী বছরের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সড়ক নিরাপত্তায় একটি পূর্ণাঙ্গ, সময়বদ্ধ ও পরিমাপযোগ্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
তিনি বলেন, পরিকল্পনায় কোন মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা সংস্থা কী কাজ করবে, কখন করবে এবং কাজের অগ্রগতি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
পরবর্তী জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে আগের এক বছরের কার্যক্রমের প্রকাশ্য মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং কেন তা পূরণ হয়নি এসব তথ্য দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে। দুর্বলতার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী বছরের পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। নতুন কোনো ঝুঁকি বা প্রয়োজন দেখা দিলে সেটিও পরিকল্পনায় যুক্ত করতে হবে।
তাঁর মতে, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন ও সংশোধনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস কেবল আনুষ্ঠানিক দিবস হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সড়ক নিরাপত্তায় দৃশ্যমান অগ্রগতি পরিমাপের গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠবে।
বার্তার শেষাংশে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনাকে নিয়তি হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে না। প্রতিটি ঝুঁকি চিহ্নিত করা, আইন প্রয়োগের দাবি তোলা, নিরাপদ অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং সড়কে প্রতিটি মানুষের জীবনের মূল্য রক্ষায় সবাইকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
সরকার, পরিবহনমালিক-শ্রমিক, চালক, যাত্রী, পথচারী, গণমাধ্যম, নাগরিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিরাপদ সড়ক গড়ে তোলা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নিসচার কর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আবারও সড়ক নিরাপত্তার কাজে যুক্ত হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, সড়কে প্রতিটি জীবন মূল্যবান। নিরাপদ সড়ক গড়তে সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।
যে আই