দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

সিনেমা বানানোর স্বপ্ন অনেকেই দেখেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে পড়াশোনার ফাঁকে সময় বের করা, টিউশনি করে টাকা জমানো, নিজের উপার্জন খরচ করা—সহজ নয়। এমন কঠিন পথেই হেঁটেছেন একদল বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ। তাঁদের কেউ চুয়েটে, কেউ বুয়েটে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। ভিন্ন ক্যাম্পাসের ৪০ জনের বেশি শিক্ষার্থী এক হয়েছেন একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্নে। তাঁদের সেই সিনেমার নাম ‘অন্যপাতা’। সবকিছু পরিকল্পনামতো এগোলে আগামী দুর্গাপূজায় দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে ছবিটি।
‘অন্যপাতা’ নির্মাণের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল মাত্র ছয়জনকে নিয়ে। সময়ের সঙ্গে ছোট সেই দলে যুক্ত হয়েছেন আরও অনেকে। কেউ অভিনয় করেছেন, কেউ ক্যামেরার পেছনে কাজ করেছেন, কেউ সামলেছেন সংগীত কিংবা সম্পাদনার দায়িত্ব। এভাবেই দুই বছরের চেষ্টায় এসজেএ প্রোডাকশনের ব্যানারে তৈরি হয়েছে সিনেমাটি। পেশাদার চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা সবার ছিল না। ছিল না বড় কোনো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহায়তাও। তবু নিজেদের সামর্থ্য ও কাজের প্রতি ভালোবাসাকে ভরসা করেই এগিয়েছেন তাঁরা।
যে সময়ের গল্প অনেকেরই চেনা
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতির দিনগুলো কারও কাছে স্বপ্ন পূরণের অপেক্ষা, কারও কাছে দুশ্চিন্তার দীর্ঘ সময়। ভালো ফল করার চাপ, পরিবারের প্রত্যাশা, অর্থের সংকট, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এই সময় একজন তরুণের জীবনকে বদলে দিতে পারে। এর মধ্যেই তৈরি হয় বন্ধুত্ব, কখনো জন্ম নেয় ভালোবাসা, আবার কখনো নিজের পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয় নানা প্রশ্ন।
‘অন্যপাতা’র গল্পে উঠে এসেছে এমনই এক তরুণের জীবন। আর্থিক সংকটের মধ্যেও সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চেষ্টা চালিয়ে যায়। সেই পথের নানা টানাপোড়েনের মধ্যে তার জীবনে আসে প্রেম। বাস্তব জীবনের দুটি ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গল্পটি তৈরি করেছেন সিনেমার পরিচালক মো. শাহেজাহান এ্যানি। তিনি চুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী।
এ্যানির কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময়টা শুধু একটি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সময় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘদিনের চেষ্টা, মানসিক চাপ এবং এমন কিছু অভিজ্ঞতা, যা সহজে ভুলে যাওয়া যায় না। সেই দিনগুলোর অনুভূতি নিয়েই তিনি গল্পটি সাজিয়েছেন। তাঁর প্রত্যাশা, সিনেমাটি দেখতে গিয়ে দর্শক পর্দার চরিত্রগুলোর মধ্যে নিজেদের জীবনের পরিচিত কোনো মুহূর্ত খুঁজে পাবেন।
ক্যাম্পাসের ব্যস্ততার মাঝেও চলেছে সিনেমার কাজ
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে সেমিস্টারের ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট ও অন্যান্য কাজের চাপ নতুন কিছু নয়। এর পাশাপাশি একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে প্রয়োজন বাড়তি সময় ও পরিশ্রম। ‘অন্যপাতা’র দলের সদস্যদেরও সামলাতে হয়েছে এই দুই দিক। নিয়মিত পড়াশোনার সঙ্গে মিলিয়ে শুটিংয়ের সময় বের করা, কাজের পরিকল্পনা করা এবং প্রয়োজনীয় খরচ জোগাড় করা—সবই ছিল তাঁদের পথচলার অংশ।
সিনেমাটির অর্থায়ন এসেছে মূলত নিজেদের উপার্জন ও ব্যক্তিগত সঞ্চয় থেকে। টিউশনির টাকা ও নিজেদের পকেটের অর্থ খরচ করে কাজ এগিয়ে নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন নিয়মকানুন ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কেও শিখতে হয়েছে কাজের মধ্য দিয়ে। সীমাবদ্ধতা থাকলেও নিজেদের একটি সিনেমা তৈরির ইচ্ছা থেকে সরে আসেননি তাঁরা।
প্রযোজক অংকন দে অনিমেষ চুয়েটের শিক্ষার্থী। তাঁর সঙ্গে প্রযোজনার দায়িত্বে রয়েছেন বুয়েটের শিক্ষার্থী সামস আবতাহী ইসমাম। তাঁদের আশা, পরিচিত জীবনের গল্প হলেও সিনেমার উপস্থাপনা দর্শকের কাছে নতুন লাগবে। তরুণদের কথাবার্তা, অভিজ্ঞতা এবং মিষ্টি কমেডির ছোঁয়া ছবিটিকে আলাদা স্বাদ দেবে বলে মনে করছেন তাঁরা।
একটি সিনেমায় ছড়িয়ে আছে অনেকের কাজ
‘অন্যপাতা’ শুধু পরিচালক বা অভিনয়শিল্পীদের কাজ নয়। এর বিভিন্ন অংশে যুক্ত হয়েছেন চার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সিনেমার প্রধান দুই চরিত্রে অভিনয় করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরিয়া শাকিল ও প্রত্যাশা ঘোষ। তাঁদের সঙ্গে অভিনয় করেছেন শাইম, নোমান, অনিমেষ, একুশী, ইমরান, মনন, রোবেনসহ আরও অনেকে।
ক্যামেরার দায়িত্বে ছিলেন ইব্রাহিম বিন আনছারী। শিল্পনির্দেশনায় কাজ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইন্দ্র নীল। ছয়টি মৌলিক গানের সংগীত পরিচালনা করেছেন ফাহরিয়াজ তাসজিম মনন। সিনেমার আবহসংগীত তৈরি করেছেন আইনান। পোস্ট-প্রোডাকশন ও কালার গ্রেডিংয়ের কাজ করেছেন চুয়েটের শিক্ষার্থী তানভীর জানি। ভিএফএক্সে ছিলেন বুয়েটের শিক্ষার্থী মাসরাফি ইসলাম শাফিন। কাস্টিং পরিচালনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নোমান আহমদ রনি। সংলাপ লিখেছেন বুয়েটের ইশরাক নূর ও চুয়েটের ইকবাল রাফিদ। আর লাইন প্রোডাকশনের দায়িত্ব সামলেছেন উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী সুদীপ্ত পাল।
প্রায় ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের সিনেমাটিতে রয়েছে ছয়টি মৌলিক গান, আবহসংগীত এবং চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্যের উপস্থাপনা। গল্প ও সংলাপে বর্তমান প্রজন্মের ভাষা ও জীবনযাপনের ধরন তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন নির্মাতারা।
দুই বছরের স্বপ্ন এবার বড় পর্দায়
দুই বছরের কাজ শেষে ‘অন্যপাতা’কে বড় পর্দায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে সিনেমাটির ঘোষণামূলক পোস্টার, মোশন ভিডিও ও মূল পোস্টার। সামনে প্রকাশিত হবে আনুষ্ঠানিক ট্রেলার ও মিউজিক ভিডিও। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দুর্গাপূজায় প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে ছবিটি।
শিক্ষার্থীদের কাছে সিনেমাটি নির্মাণের অভিজ্ঞতা যেমন নতুন, তেমনি নিজেদের তৈরি কাজ দর্শকের সামনে তুলে ধরার অপেক্ষাও বিশেষ। যে গল্পের পেছনে তাঁরা সময় দিয়েছেন, নিজেদের উপার্জনের টাকা খরচ করেছেন এবং একসঙ্গে কাজ শিখেছেন, এবার সেই গল্প পৌঁছাবে প্রেক্ষাগৃহে।
‘অন্যপাতা’ দর্শকের মনে কতটা জায়গা করে নিতে পারে, তার উত্তর মিলবে মুক্তির পর। তবে সিনেমাটি নির্মাণের মধ্য দিয়ে নিজেদের একটি স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে ইতিমধ্যে অনেকটা এগিয়ে গেছেন এই তরুণেরা।
এমএস/