দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যুক্তরাষ্ট্র সরকার এক যৌথ অভিযানে ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের বিটকয়েন জব্দ করেছে। একইসঙ্গে কেম্বোডীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ‘প্রিন্স গ্রুপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেন ঝির বিরুদ্ধে বিশাল এক ক্রিপ্টোকারেন্সি জালিয়াতির অভিযোগ এনেছে।
মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) নিউইয়র্কে চেন ঝির বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও প্রতারণা ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য উভয় দেশই তার ব্যবসা ও সম্পদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, লন্ডনে তার নেটওয়ার্কের মালিকানাধীন ১৯টি সম্পদ জব্দ করা হয়েছে, যার মধ্যে একটি ভবনের মূল্য প্রায় ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড (১৩৩ মিলিয়ন ডলার)।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, এটি ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক অভিযান এবং এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিটকয়েন জব্দের ঘটনা। প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার ২৭১ বিটকয়েন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হেফাজতে রয়েছে।
চেন ঝি, যিনি এখনও পলাতক, ‘প্রিন্স গ্রুপ’-এর মাধ্যমে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণা চক্রের মূল হোতা বলে অভিযোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ।
কেম্বোডিয়াভিত্তিক এই কোম্পানির ওয়েবসাইটে বলা হয়, তাদের ব্যবসা মূলত রিয়েল এস্টেট, আর্থিক সেবা ও ভোক্তা খাতে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এটি এশিয়ার সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক অপরাধ সংগঠনগুলোর একটি।
বিচার বিভাগের দাবি, অনলাইনে শিকারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মিথ্যা বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি হাতিয়ে নেওয়া হতো। আদালতের নথি অনুযায়ী, চেন ঝির নির্দেশে কেম্বোডিয়ায় কমপক্ষে ১০টি প্রতারণা কেন্দ্র তৈরি করা হয়, যেখানে হাজার হাজার মানুষকে লক্ষ্য করে প্রতারণা চালানো হতো।
অভিযোগে বলা হয়েছে, তার সহযোগীরা লাখ লাখ মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে ‘ফোন ফার্ম’ স্থাপন করে, যেখান থেকে কল সেন্টার স্ক্যাম চালানো হতো। একেকটি স্থাপনায় ১,২৫০ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে প্রায় ৭৬ হাজার ভুয়া সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট পরিচালিত হতো।
প্রিন্স গ্রুপের প্রশিক্ষণ নথিতে কর্মীদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল যাতে তারা অতিরিক্ত আকর্ষণীয় নারীর ছবি ব্যবহার না করে, যাতে প্রোফাইলগুলো বাস্তব মনে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল জন আইজেনবার্গ বলেছেন, ‘প্রিন্স গ্রুপ মানবিক দুর্ভোগের ওপর দাঁড়ানো একটি অপরাধ সাম্রাজ্য।’
তিনি আরও জানান, এই চক্র জোর করে শ্রমিকদের আটক রাখত এবং তাদের দিয়ে অনলাইনে প্রতারণার কাজ করাত। প্রাপ্ত অর্থ বিলাসবহুল ভ্রমণ, বিনোদন ও দামি সামগ্রী কেনায় ব্যবহার করা হতো।
বিচার বিভাগ বলেছে, অপরাধের অর্থে চেন ঝি ও তার সহযোগীরা প্রাইভেট জেট, বিলাসবহুল ঘড়ি এবং এমনকি নিউইয়র্কের এক নিলাম প্রতিষ্ঠান থেকে পিকাসোর আঁকা চিত্রও কিনেছিল।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে চেন ঝির সর্বোচ্চ ৪০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, চেন ঝি ও তার সহযোগীরা ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে ব্যবসা নিবন্ধন করে এবং লন্ডনে বিভিন্ন সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করে। তাদের সম্পদের মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় লন্ডনের ১০০ মিলিয়ন পাউন্ডের অফিস ভবন, উত্তর লন্ডনের ১২ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের একটি প্রাসাদ এবং আরও ১৭টি ফ্ল্যাট।
এই নিষেধাজ্ঞার ফলে চেন ঝি এখন যুক্তরাজ্যের আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন। প্রিন্স গ্রুপকেও যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধী সংগঠন হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপার বলেছেন, ‘তারা অসহায় মানুষের জীবন ধ্বংস করেছে এবং লন্ডনের বাড়ি কিনে অর্থ পাচার করেছে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একত্রে এই বৈশ্বিক প্রতারণা নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছি।’
পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, চেন ঝি ও প্রিন্স গ্রুপ কেম্বোডিয়ায় ক্যাসিনো ও প্রতারণা কেন্দ্র গড়ে তুলেছিল এবং সেখান থেকেই অর্থ পাচার করা হতো।
প্রিন্স গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও চারটি প্রতিষ্ঠান—জিন বেই গ্রুপ, গোল্ডেন ফর্চুন রিসর্টস ওয়ার্ল্ড, এবং বাইএক্স এক্সচেঞ্জ—এর ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে এই বছর জিন বেই গ্রুপ ও গোল্ডেন ফর্চুন রিসর্টসের দুটি কেন্দ্রকে জোরপূর্বক শ্রম ও নির্যাতনের কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মতে, এসব প্রতারণা কেন্দ্রে বহু বিদেশি নাগরিককে চাকরির প্রলোভনে এনে পরে নির্যাতনের হুমকি দিয়ে জোরপূর্বক প্রতারণার কাজে লাগানো হতো।
এমন প্রতারণা ‘শিল্প পর্যায়ের’—যার কিছু অংশ যুক্তরাজ্যেও পরিচালিত হয়, যেখানে ভুয়া প্রেমের সম্পর্ক দেখিয়ে মানুষকে ফাঁদে ফেলা হয়, বলেছে পররাষ্ট্র দপ্তর।
যুক্তরাজ্যের প্রতারণা বিষয়ক মন্ত্রী লর্ড হ্যানসন বলেন, ‘প্রতারকরা অসহায় মানুষের জীবন সঞ্চয় চুরি করছে, বিশ্বাস ধ্বংস করছে, জীবন নষ্ট করছে। আমরা তা সহ্য করব না।’
সূত্র: বিবিসি
এমএস/