দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ছাত্র জনতার প্রবল গণ-আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর সড়ক ও জনপথের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান। এ কারণে সরকারের প্রায় সব দপ্তরে সংস্কার কাজ চললেও সড়কে চলছে লোক দেখানো পদায়ন ও আওয়ামী পুনর্বাসন।
জানা গেছে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে বাস্তবায়িত উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণকাজে সর্বনিম্ন ২৯ হাজার ২৩০ কোটি থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে ৯ অক্টোবর এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এছাড়া সওজের উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণকাজে সার্বিক দুর্নীতির হার ২৩-৪০ শতাংশ বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। টিআইবির এমন প্রতিবেদনের পরেও সড়ক প্রধানের বহাল তবিয়তে থাকাটা সড়কের বিভিন্ন মহলে ইতোমধ্যেই ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে তার ক্ষমতার উৎস নিয়ে।
সড়ক প্রধান মঈনুল শুধু বহাল তবিয়তেই নেই। বরং অভিযোগ রয়েছে তিনি সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের দোসর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনে। আওয়ামীপন্থীদের পুরস্কারস্বরূপ গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করে নতুন উপদেষ্টা-সচিবের চোখে ধুলো দিয়ে চালিয়ে দিচ্ছেন সংস্কার বলে।
এর আগে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাকালীন সময়ে এই সৈয়দ মঈনুল হাসান ১৮তম বিসিএসে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২৫ জানুয়ারি ১৯৯৯ সালে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন।
তিনি কেন্দ্রীয় বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের চলমান সদস্য। আইইবি-২০২২-২৩ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের (সবুর-মঞ্জুর প্যানেল) শেখ হাসিনার মতোই বিনাভোটে নির্বাচন করে নির্বাচিত হয়েছিলেন কাউন্সিল মেম্বার (আইইবি মেম্বার নং-১৪৫৫০)। শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে গঠিত সড়ক কমিটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরশাদ আমলে বুয়েট ছাত্রলীগ নেতাও ছিলেন সওজের এই প্রধান প্রকৌশলী। স্বযাচিত হয়ে কর্মকর্তাদের বহর নিয়ে বারবার বঙ্গবন্ধু মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হোন।
অভিযোগ রয়েছে, পলাতক সাবেক সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের চাটুকারিতা ও কারণে-অকারণে শেখ মজিবের বিভিন্ন প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেই সিরিয়ালের দোহাই দিয়ে তিনি আজ প্রধান প্রকৌশলী।
আরও জানা গেছে, তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। মঈনুল হাসানের আপন চাচাতো ভাই শামসুল আলম কচি মলিস্নকপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি এবং নড়াইল জেলা পরিষদের আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সদস্য। সাধারণ ব্যাংক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শেষ করলেও জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতিটি ভোট দেড় থেকে দুই লাখ টাকায় কিনে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেন তিনি।
মঈনুল হাসানের ভাগ্নে সহকারী প্রকৌশলী সৈয়দ মুনতাসির হাফিজ সড়ক ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির আওয়ামী প্যানেলের দুইবারের নির্বাচিত সভাপতি। এর আগেও ছিলেন একই সমিতির পর পর দুইবারের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। অভিযোগ রয়েছে সড়ক নিয়ন্ত্রণের জন্যই মঈনুলের বিশেষ হস্তক্ষেপে মুনতাসিরের উত্থান হয়। মধ্যমসারির যেকোনো কর্মকর্তার পদায়ন বা বদলিতে মঈনুলের ভাগ্নে মুনতাসিরের আর্শিবাদপুষ্ট হতে হতো। বদলি কিংবা পদায়নে আর্থিক লেনদেনের মূল দায়িত্বে থাকতো মুনতাসির। বিরোধী মতাদর্শের মধ্যমসারির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শায়েস্তা করতে মুনতাসিরের ছক অনুযায়ী করা হতো ওএসডি কিংবা শাস্তিমূলক বদলি। মুনতাসিরের একক দৌরাত্মে ঢাকা সড়ক জোন পরিণত হয় ‘মামাভাগ্নে জোনে’।
গত ৫ আগস্টের পর ট্রেইনিং ও উচ্চশিক্ষার নামে বিভিন্ন মেয়াদে ৩০ কর্মকর্তার বিদেশ গমনের অনুমোদন ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সড়ক সূত্রের তথ্য মতে, মূলত সরাসরি প্রধান প্রকৌশলী মঈনের তত্ত্বাবধানে এই ৩০ জন আওয়ামী সুবিধাভোগী কর্মকর্তার মাধ্যমেই শেখ পরিবার ও ওবায়দুল কাদেরের বিপুল অবৈধ অর্থ ইতোমধ্যেই বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অর্থপাচারের সরাসরি যুক্ত ছিলেন মঈনুল হাসান। এজন্য সড়কের একজন নিয়মিত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পরেও আওয়ামী বিশেষ মহলের সরাসরি হস্তক্ষেপে তাকে চাকরিজীবনের অধিকাংশ সময় ডেপুটেশনে বিভিন্ন পদে নিয়োগ করা হয়।
সূত্র জানায়, আলোচিত প্রধান প্রকৌশলী মঈনুল ওরফে মঈনের গ্রামের বাড়ী নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার মলিস্নকপুর ইউনিয়নের পাঁচুড়িয়া গ্রামে।
নড়াইল জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এস. এম. ফেরদৌস রহমান বলেন, সরকারি দলের নেতা হিসেবে তার সব সময়ই নড়াইল জেলায় দাপট ছিল। তিনি অর্থশালী মানুষ, তার বহুবিধ ব্যবসা আছে। জেলার প্রায় সবাই জানে মঈনের পুরো পরিবার এলাকায় সুদের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
একই ইউনিয়নের (মলিস্নকপুর) বিএনপির সভাপতি মো. খিজির আহমেদ বলেন, তার পুরো পরিবার আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এখানে আওয়ামী রাজনীতির মূল অর্থদাতাই সড়কের চিফ ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল হাসান। তার ভাই টাকার বিনিময়ে জেলা পরিষদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছে।
আরএ