দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডে ৫ হাজার টাকা ধার নেওয়া ও তা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, টাকা ফেরত দেওয়ার চাপ থেকেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে হত্যার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা কারও প্রতিশোধের যোগসূত্র ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রির প্রতিষ্ঠান ইয়েসটেকে কাজ করত এক কিশোর। প্রায় এক মাস আগে ওই কিশোর নেশা করার জন্য অপ্রতিমের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ধার নেয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরে টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার জুমার নামাজের পর পাওনা টাকা নিতে তুহিনের সঙ্গে দেখা করে অপ্রতিম। একপর্যায়ে টাকা দেওয়ার কথা বলে তাকে লালমাই পাহাড়ের দিকে নিয়ে যায় তুহিন। সেখানে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। তুহিন টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অপ্রতিম তাকে ধাক্কা দেয়। পরে তুহিন বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথার পেছনে কয়েকবার আঘাত করে বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। এ সময় ঘটনাস্থলে আরও তিন থেকে চারজন উপস্থিত ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
অপ্রতিম আহত হয়ে পড়ে থাকলে তার সঙ্গে থাকা আইফোন নিয়ে তুহিন ও তার সহযোগীরা সেখান থেকে চলে যায় বলে জানা গেছে। শুরুতে অপ্রতিমের আইফোন নিয়ে বিরোধের কথা সামনে এলেও জিজ্ঞাসাবাদে মূলত ৫ হাজার টাকা ধার নেওয়া ও তা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অপ্রতিমের বাবা বাদী হয়ে করা হত্যা মামলায় সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, শনিবার সকাল ৯টার দিকে তুহিনকে হেফাজতে নেওয়ার সময় কর্মকর্তারা অপ্রতিমের মৃত্যুর বিষয়টি জানতেন না। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তার মরদেহ উদ্ধারের খবর পান তারা।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, শুরুতে তুহিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করলেও জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে রাতে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। তবে অন্যদের নাম বলতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, অন্যদের নাম প্রকাশ না করার বিষয়ে তুহিন এক ধরনের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন বলে জানান। এ সময় তার মোবাইল ফোনে বারবার কল আসছিল।
তদন্তকারীদের নজরে আসে, তুহিনের ফোনে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা এক কিশোর ফোন করছিল। পরে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। ওই সময় তার পরনে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা টি-শার্ট ছিল। এরপর তুহিন আরও একজনের নাম বললে তাকেও পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়।
এদিকে, অপ্রতিমের সঙ্গে স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের একটি গ্রুপের যোগাযোগ ছিল বলে দাবি করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই গ্রুপের এক সদস্য। তার ভাষ্য, তুহিনের সঙ্গে প্রায় এক বছর ধরে অপ্রতিমের পরিচয় ছিল। তারা নিয়মিত একসঙ্গে আড্ডা দিতেন এবং মোটরসাইকেল নিয়ে লালমাই পাহাড় এলাকায় ঘুরতে যেতেন। তুহিন স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের কিং অব কোটবাড়ি নামের একটি গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় কিং অব কোটবাড়ি নামের গ্রুপটির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। গ্রুপটির একাধিক ছবিতে অপ্রতিমকে দেখা গেছে এবং মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়ার ছবিও রয়েছে। তবে ওই গ্রুপের সঙ্গে অপ্রতিমের সম্পৃক্ততা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অপ্রতিমের পরিবারের সদস্যরা নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে খুঁজতে বের হলে তুহিনসহ অন্যরাও তাদের সঙ্গে ছিলেন বলে জানা গেছে। শনিবার মরদেহ উদ্ধারের সময়ও তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। পরে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হত্যাকারীদের নিয়ে একাধিক ভিডিও শেয়ার করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে গ্রেপ্তার হওয়া কিশোরটি মাত্র ১০ দিন আগে বিনা বেতনে কাজ শুরু করেছিল বলে জানিয়েছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহাত শীলা। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে শিক্ষক সমিতির আয়োজিত মানববন্ধনে তিনি এ তথ্য জানান।
ড. কামরুন নাহাত শীলা আরও জানান, অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্যকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন। এসব ঘটনার সঙ্গে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে বের করার দাবি জানিয়েছেন নাহিদা বেগম।
তিনি বলেন, ম্যাডাম চান, পুলিশ তদন্ত করে বিষয়টি বের করুক—এই প্রতিশোধের জেরেই তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে কি না।
নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শনিবার বেলা ১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে সে নিখোঁজ ছিল।
এমএস/