দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের পর দেশীয় অস্ত্রের মহড়ার অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে কয়েকজনের হাতে রামদা, ছুরি, চাপাতি, জিআই পাইপ ও লাঠিসোটাসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র দেখা গেছে। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও বহিরাগত প্রবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা।
ঘটনার সূত্রপাত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ইবির শহীদ জিয়াউর রহমান হলের নিচতলার করিডোরে। হলের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হল শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি কাজী জুহায়ের ক্রাচে ভর দিয়ে করিডোর দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় হলের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসার পর শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আলীনুর রহমানের সঙ্গে তাঁর কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে আলীনুর তাঁকে থাপ্পড় দেন। পরে দুজনের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হল শাখা ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দুই পক্ষ হল প্রভোস্টের কার্যালয়ের সামনে পাল্টাপাল্টি স্লোগান দেয়। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়।
অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা আলীনুর দৌড়ে হলের ২১৭ নম্বর কক্ষে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। পরে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা তাঁকে ধরতে ওই কক্ষে গেলে জানালায় ভাঙচুর ও দরজায় লাথি মারার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি শান্ত করতে প্রক্টরিয়াল বডির উপস্থিতিতে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়।
পরে প্রক্টরিয়াল বডি ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই পক্ষকে সরিয়ে দেয়। তাঁদের সহায়তায় আলীনুরকে হলের কক্ষ থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁকে প্রক্টরের গাড়িতে তোলার সময় ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মারমুখী অবস্থানের অভিযোগ ওঠে। এ সময় প্রক্টর ও ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার গায়ে কিল-ঘুষি লাগে এবং প্রক্টরের গাড়ির গ্লাস ভাঙচুর করা হয় বলে জানা গেছে।
এরপর ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার অভিযোগ তুলে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করে ছাত্রদল। মিছিলটি ডায়না চত্বর প্রদক্ষিণ করে প্রধান ফটকে গিয়ে শেষ হয়। একই সময়ে জিয়া মোড়, লালন শাহ হল ও শাহ আজিজ হলের পকেট গেট এলাকায় লাঠিসোটা ও জিআই পাইপ হাতে কয়েকজনকে অবস্থান করতে দেখা যায়। ছাত্রদলের মিছিলের কাছাকাছি সময়ে ক্যাম্পাসে দেশীয় অস্ত্রের মহড়ার ছবিও ছড়িয়ে পড়ে।
ছড়িয়ে পড়া ছবিতে কয়েকজনের হাতে রামদা, ছুরি, চাপাতি, জিআই পাইপ ও গাছের ডালসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র দেখা যায়। এসব ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনা ও আতঙ্ক তৈরি হয়। ক্যাম্পাসের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় বহিরাগতরা কীভাবে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করল এবং দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কারা অবস্থান করেছিল।
এ ঘটনায় গতকাল ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে। ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে হল দখলের রাজনীতি ও ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার অভিযোগ তোলেন শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদ রুমি মিথুন। অন্যদিকে, ঘটনার সূত্রপাত ছাত্রদলের নেতার হাত ধরে হয়েছে দাবি করে স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদল-যুবদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়ার অভিযোগ তোলেন শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম রাফি।
রাশেদুল ইসলাম রাফি বলেন, ক্যাম্পাসের ভেতরে ও বাইরে দেশীয় অস্ত্রের মহড়ায় ছাত্রশিবিরের কোনো নেতাকর্মী জড়িত ছিলেন না। কারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়েছে, তা বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ প্রশাসনকে খুঁজে বের করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন।
শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদ রুমি মিথুন বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের কোনো নেতাকর্মী দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয়নি। তাঁর দাবি, ক্যাম্পাসে ঘটনার পর স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার উদ্দেশ্যে এগিয়ে এলে স্থানীয় জনগণ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা তাঁদের প্রতিহত করেন। ক্যাম্পাসে কারা লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নিয়েছিল, তা প্রশাসনকে খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।
ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মামুনুর রশীদ বলেন, সংঘর্ষের পর পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ঘটনার সময় তিনি জিয়া হল থেকে আলীনুরকে উদ্ধারের কাজে ছিলেন। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে কোনো অস্ত্রধারীকে পাওয়া যায়নি। তবে ক্যাম্পাসের ভেতরে ও বাইরে কারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়েছে, তাঁদের শনাক্তে পুলিশের কার্যক্রম চলছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। হলের ঘটনা ছাড়াও ঘটনার পূর্বাপর সব বিষয় তদন্ত করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তারা দায়িত্ব পালন করবে।
এমএস/