দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

সম্মেলনের এক বছর পেরিয়ে গেলেও লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির আওতাধীন ১১টি উপজেলা ও পৌর ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়নি। কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। পদপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, নেতৃত্ব নির্বাচনের পরও সাংগঠনিক কাঠামো পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় দলীয় কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগে লক্ষ্মীপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও পৌর বিএনপির ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে বিভিন্ন ইউনিটে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচিত হওয়ায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে তখন ব্যাপক উৎসাহ তৈরি হয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল, নির্বাচিত নেতৃত্বের সঙ্গে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে দলকে সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী করা হবে। কিন্তু এক বছরেও সেই প্রক্রিয়া শেষ হয়নি।
সম্মেলনে লক্ষ্মীপুর পৌর বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন রেজাউল করিম লিটন, সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক হোসেন ও আলমগীর হোসেন। সদর উপজেলা পশ্চিম বিএনপিতে সভাপতি মাহবুবুর রহমান খোকন, সাধারণ সম্পাদক মহি উদ্দিন বিটু এবং সাংগঠনিক সম্পাদক সাইদুর রহমান চৌধুরী ভুট্টু ও জাকির হোসেন ভূঁইয়া নির্বাচিত হন।
রায়পুর উপজেলা বিএনপিতে সভাপতি নাজমুল ইসলাম মিঠু, সাধারণ সম্পাদক সফিকুর রহমান মিঠু এবং সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুল আলম ও শাহরিয়ার কবির ফয়সাল নির্বাচিত হন। রায়পুর পৌর বিএনপিতে সভাপতি এবিএম জিলানী, সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম লিটন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আনিসুর রহমান ও নূরে ই আলম মুকুল দায়িত্ব পান।

সদর উপজেলা পূর্ব বিএনপিতে সভাপতি মাইন উদ্দিন চৌধুরী রিয়াজ, সাধারণ সম্পাদক এমরান হোসেন ও সাংগঠনিক সম্পাদক জিয়া; চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা বিএনপিতে সভাপতি বেলাল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আবু ইউছুপ ভূঁইয়া এবং সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম লিটন ও সোহেল মাহমুদ নির্বাচিত হন।
এ ছাড়া রামগঞ্জ উপজেলা বিএনপিতে সভাপতি মোজাম্মেল হক মজু, সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম পিন্টু ও আবুল বাশার সতু; রামগঞ্জ পৌর বিএনপিতে সভাপতি শেখ মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন পলাশ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ইকবাল হোসেন ও মোহাম্মদ বাবলু নির্বাচিত হন।
কমলনগর উপজেলা বিএনপিতে সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরী, সিনিয়র সহ-সভাপতি গোলাম কাদের ও সাধারণ সম্পাদক মো. দিদার হোসেন; রামগতি উপজেলা বিএনপিতে সভাপতি ডা. জামাল উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক সিরাজ উদ্দিন এবং রামগতি পৌর বিএনপিতে সভাপতি সাহেদ আলী পটু ও সাধারণ সম্পাদক আল আমীন মুর্তজা নির্বাচিত হয়েছেন।
সহসাই পূর্ণাঙ্গ কমিটি হবে:
রায়পুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নাজমুল ইসলাম মিঠু বলেন, ‘আমরা পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে আলোচনা করছি। এখনো পূর্ণাঙ্গ করতে পারিনি। সহসাই পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে জমা দেব।’
চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু ইউছুপ বলেন, ‘আমাদের কমিটির বয়স এক বছর হয়েছে। এখনো জেলা বিএনপি থেকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের জন্য নির্দেশনা পাইনি।’
তবে জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলের নেতারা।
লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাসিবুর রহমান হাসিব বলেন, ‘উপজেলা ও পৌর কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার জন্য আমরা নির্দেশনা দিয়েছি।’
জেলা বিএনপির সম্মেলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের তিন মাসের আহ্বায়ক কমিটির বয়স চার বছর হয়েছে। কেন্দ্রীয় বিএনপি জেলা কমিটির সম্মেলনের জন্য যে তারিখ দেবে, তখনই জেলা বিএনপির সম্মেলন হবে। জেলা বিএনপির সম্মেলন করার জন্য জেলা কমিটি প্রস্তুত রয়েছে।’

একটিও পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা হয়নি:
লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব শাহাবুদ্দিন সাবু বলেন, ‘জেলার পৌর ও উপজেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখনো কোনো ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে পৌর ও উপজেলা কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ হবে। আমাদের কমিটিগুলো আরও আগে পূর্ণাঙ্গ করতে পারলে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি পেত।’
জেলা কমিটিতেও চার বছরের ‘অপেক্ষা’:
উপজেলা ও পৌর ইউনিটগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি জেলা বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দলীয় নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তিন মাসের জন্য গঠিত জেলা আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ ইতোমধ্যে চার বছর অতিক্রম করেছে। কেন্দ্র থেকে সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ না হওয়ায় জেলা কমিটির সম্মেলনও হচ্ছে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক শক্তি অনেকাংশেই নির্ভর করে তৃণমূলের সক্রিয় ও পূর্ণাঙ্গ কমিটির ওপর। বিশেষ করে নির্বাচন সামনে রেখে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, পৌর ও উপজেলা পর্যায়ে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের সমন্বিত কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সম্মেলনের এক বছর পরও ১১টি ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় দলটির মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

তৃণমূলের পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সম্মেলনের পর থেকেই তারা পূর্ণাঙ্গ কমিটির অপেক্ষায় রয়েছেন। দীর্ঘ অপেক্ষায় অনেকের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। যোগ্য ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা না করলে এর প্রভাব আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা তাদের।
এদিকে, জেলা বিএনপি বলছে, ইউনিটগুলোর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে জমা দিতে বলা হয়েছে। এখন স্থানীয় নেতৃত্বের উদ্যোগের ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে কমিটি গঠনের পরবর্তী প্রক্রিয়া।
সব মিলিয়ে সম্মেলনের মাধ্যমে ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচনের এক বছর পরও লক্ষ্মীপুর বিএনপির ১১ ইউনিটের সাংগঠনিক কাঠামো পূর্ণাঙ্গ না হওয়া নিয়ে তৃণমূলে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত নিরসন করাই এখন জেলা নেতৃত্বের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন—তার আগেই এই সাংগঠনিক জট কাটাতে না পারলে মাঠের রাজনীতিতে এর প্রভাব কতটা পড়বে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
কেএম