দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

রংপুরের আলোচিত একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন পুলিশ কমিশনার। তদন্তে বেরিয়ে আসা নানা তথ্য রোববার (২৩ আগস্ট) তুলে ধরার সময় সবচেয়ে বেশি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি পরিবারের ছোট ছেলে প্রিয়মের কথা বলতে গিয়ে। রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীকে স্মরণ করে পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘প্রিয়ম আমার ছেলের সমান বয়সী।’
রংপুরের সেই চার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। শুরুতে ঘটনাটি ডাকাতি বলে মনে হলেও তদন্তে উঠে আসছে সেই রাতের ভিন্ন চিত্র।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন এলাকায় সম্মানিত একজন শিক্ষক। কারও সঙ্গে তার কোনো বিরোধ বা কলহ ছিল না। অথচ সেই শান্ত পরিবারটির ওপরই নেমে আসে ভয়াবহ ঘটনা।
পুলিশের দাবি, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পাশের ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ নামের দুই যুবক। তারা পরস্পর মামাতো ভাই। তদন্তে উঠে এসেছে, ছাদে বসে তারা মাদক সেবন করছিল।
রাতে শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে যান। তখন তার পরনে কোনো জামা ছিল না, কাঁধে ছিল একটি গামছা। ছাদে অপরিচিত দুই যুবককে দেখে তিনি সেখানে বসে থাকার কারণ জানতে চান। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে হামলার শিকার হন তিনি।
এরপর শব্দ শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সিঁড়িতেই তিনিও হামলার শিকার হন। মায়ের চিৎকার শুনে এগিয়ে আসেন মেয়ে পার্থী চক্রবর্তী। শেষ পর্যন্ত তিনিও রেহাই পাননি।
সবশেষে হত্যার শিকার হয় পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য প্রিয়ম। রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর কথাই তদন্তের নানা তথ্যের মধ্যে পুলিশ কমিশনারকে সবচেয়ে বেশি আবেগাপ্লুত করে তোলে। এক রাতেই পরিবারের চার সদস্যকে হারানোর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তার চোখে পানি চলে আসে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, হত্যাকাণ্ডের পরও ওই দুই যুবক বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়নি। বরং কিছু সময় তারা ওই বাড়িতেই অবস্থান করে। সেখানে মাদক সেবনেরও আলামত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পরে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট তুলনামূলক ফাঁকা হয়ে গেলে তারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। বের হওয়ার সময় সঙ্গে নিয়ে যায় স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন জিনিস।
তদন্তকারীদের ধারণা, পুরো ঘটনাটিকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর জন্য বাড়ির বিভিন্ন জিনিসপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করা হয়েছিল। ঘটনাস্থলে একটি চুড়ি আগুন দিয়ে পরীক্ষা করার চিহ্নও পাওয়া যায়। এতে পুলিশের সন্দেহ হয়, স্বর্ণ সম্পর্কে ভালো ধারণা রয়েছে এমন কেউ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
পুলিশ জানায়, আটক সিদ্ধার্থ দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বর্ণের দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করতেন। ফলে আসল স্বর্ণ ও ইমিটেশন শনাক্ত করার অভিজ্ঞতা তার রয়েছে বলে তদন্তকারীদের ধারণা।
এ ছাড়া বাড়িতে থাকা দুটি মোবাইল ফোনও ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল বলে পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। ঘটনার পর লুট হওয়া কিছু স্বর্ণালংকারও উদ্ধার করেছে পুলিশ।
রোববার ভোরে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের রাতের বিভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তবে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আসলে কী ছিল, পরিকল্পনায় আর কেউ জড়িত ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। তদন্তকারীরা বলছেন, জিজ্ঞাসাবাদ ও আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে সামনে আসতে পারে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
/অ