দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

কক্সবাজারে ইয়াবা মামলায় ঘটেছে চলচ্চিত্র ‘আয়নাবাজি’-এর গল্পের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা। তবে এখানে ভাড়ায় কারাভোগ নয়; অন্য ব্যক্তির নাম ও ঠিকানা ব্যবহার করে ইয়াবা মামলায় আসামি হন এক ব্যক্তি। পরে মূল আসামি জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে চলে গেলে একই নাম-ঠিকানার নির্দোষ এক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে যান।
ঘটনাটি শুরু হয় ২০২০ সালের ১ মার্চ। ওইদিন কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের উত্তর মিঠাছড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরদিন কক্সবাজার সদর থানায় মামলা করা হয়।
মামলার এজাহারে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া এক ব্যক্তির পকেটে পাওয়া জন্মনিবন্ধন সনদের ফটোকপির সূত্র ধরে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে ‘সোনা মিয়া’ নাম উল্লেখ করে পুলিশ। তবে তদন্ত শেষে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে তার নাম-ঠিকানা সঠিকভাবে পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়।
মামলার দ্বিতীয় আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার ওই ব্যক্তি দুই বছরের বেশি সময় কারাগারে থাকার পর ২০২২ সালের ১৩ জুন জামিনে মুক্তি পান। এরপর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত মামলার পাঁচ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন।
রায়ের পর গত ২৩ জুন র্যাব-১৫ চকরিয়ার ডুলাহাজারা এলাকা থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানামূলে ‘সোনা মিয়া’ নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। আদালতের নির্দেশে তাকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
কিন্তু কারাগারে যাওয়ার দুই-তিন দিন পর ওই ব্যক্তি জেল সুপারের কাছে আবেদন করে দাবি করেন, তিনি এই মামলার আসামি নন। এরপর কারা কর্তৃপক্ষ ২০২০ সালে একই মামলায় কারাগারে থাকা ‘সোনা মিয়া’র ছবি, আঙুলের ছাপ, ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে বর্তমানে কারাগারে থাকা ব্যক্তির তথ্য মিলিয়ে ব্যাপক গড়মিল দেখতে পায়।
বিষয়টি জেলা ও দায়রা জজকে জানানো হলে আদালতের নির্দেশে তদন্ত শুরু করে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ। গত ২ জুলাই আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে পুলিশ জানায়, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া এবং ২০২৬ সালে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরের জন্য গ্রেপ্তার হওয়া ‘সোনা মিয়া’ একই ব্যক্তি নন।
তদন্তে উঠে আসে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান। তিনি পুলিশের কাছে নিজেকে ‘সোনা মিয়া’ হিসেবে পরিচয় দেন এবং একটি জন্মনিবন্ধন সনদ দেখান। সেই সনদে থাকা নাম-ঠিকানার ভিত্তিতেই মামলার নথিতে পরিচয়টি ব্যবহৃত হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে বর্তমানে কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার পরিবারের দাবি, তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ। মূল আসামি রমজান তার নাম ও ঠিকানা ব্যবহার করে নিজেকে আড়াল করেছেন। স্বামীকে এই মামলায় ফাঁসানো হয়েছে দাবি করে ন্যায়বিচার চেয়েছেন সোনা মিয়ার স্ত্রী।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান বলেন, মামলা দায়ের থেকে শুরু করে অভিযোগপত্র এবং পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে তদন্তকারী কর্মকর্তার চরম গাফেলতি ছিল। আসল আসামির পরিবর্তে অন্য একজনকে গ্রেপ্তার করে কারাভোগ করানো কোনোভাবেই কাম্য নয়।
কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ঘটনাটিকে ‘আয়নাবাজি সিনেমার চেয়ে কম নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, দুই ব্যক্তি পূর্বপরিচিত এবং রোহিঙ্গা। তবে কারাগারে যাওয়ার আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা আদালতের কাছে বর্তমানে গ্রেপ্তার সোনা মিয়া নিজেকে নির্দোষ দাবি করেননি। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে যাওয়ার পরই তিনি নিজেকে মামলার এজাহারে উল্লেখিত সোনা মিয়া নন বলে দাবি করেন।
ঘটনায় নির্দোষ সোনা মিয়ার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি মূল আসামি রমজানকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
যে আই