দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

দেশের অন্যতম প্রধান ইলিশ উৎপাদনকারী জেলা ভোলায় গত কয়েক বছর ধরে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশের সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভরা মৌসুমেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ না পেয়ে হতাশ জেলেরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্যতা সংকট, দূষণ, ডুবোচর, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার ও জাটকা নিধনের মতো মানবসৃষ্ট কারণেই ইলিশের প্রাকৃতিক আবাস ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে।
জেলার দুই লাখের বেশি জেলে মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, বছরের বিভিন্ন সময়ে ২২ দিনের প্রজননকাল, দুই মাসের অভয়াশ্রম এবং জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় দীর্ঘ সময় মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও নদীতে আগের মতো ইলিশ মিলছে না। এতে জীবিকা সংকটে পড়েছেন তারা।
ভোলার তুলাতলীর জেলে মনির মাঝি বলেন, আগে এই সময়ে জাল তুললেই ইলিশ পাওয়া যেত। এখন দুই-তিন দিন নদীতে থেকেও খালি হাতে ফিরতে হয়। তেলের খরচই ওঠে না। আরেক জেলে সিরাজ মাঝি বলেন, নিষেধাজ্ঞা মানলেও তার সুফল মিলছে না, সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
মৎস্য বিভাগ জানায়, পরিসংখ্যানে গত কয়েক বছরে ইলিশ আহরণের পরিমাণ বেড়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ভোলায় ইলিশ আহরণ হয়েছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭২২ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৯১ হাজার ৬৮৩ মেট্রিক টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আহরণ হয় ১ লাখ ৯১ হাজার ৮৭৮ মেট্রিক টন। তবে সর্বশেষ অর্থবছরে তা কিছুটা কমে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টনে নেমে এসেছে। একই সময়ে জেলে, ট্রলার ও মাছ ধরার সক্ষমতা বাড়লেও প্রকৃত উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মৎস্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ভোলায় বছরে প্রায় এক হাজার ৯২০ কোটি টাকার ইলিশ কেনাবেচা হয়। জেলার ১৫৯টি আড়তে প্রতিদিন গড়ে ৫১৫ মেট্রিক টন ইলিশ বিক্রি হয় এবং স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর প্রায় ৭০ শতাংশ ইলিশ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, গত কয়েক বছরে জেলায় মাছ আহরণ, জেলে ও ট্রলারের সংখ্যা বেড়েছে। তবে নদীতে ডুবোচর, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণের কারণে ইলিশের প্রাপ্যতা কমে গেছে। এ বিষয়ে জেলেদের সচেতন করতে নিয়মিত কাজ করা হচ্ছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ইলিশ রক্ষায় নদীকে বেহুন্দি, চরঘেরা ও ছোট ফাঁসের নিষিদ্ধ জালমুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে জাটকা সংরক্ষণ অভিযান কার্যকর করা, নদীর মোহনায় পরিকল্পিত ড্রেজিং, সব জেলেকে প্রণোদনার আওতায় আনা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা জরুরি। এসব বাস্তবায়ন হলে শুধু ইলিশ নয়, নদীর অন্যান্য দেশীয় মাছের উৎপাদনও বাড়বে।
ভোলায় ইলিশ সম্পদ নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা গ্রামীণ জন উন্নয়ন (জিজিইউএস)-এর মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান বলেন, প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট নানা কারণে ইলিশের সংকট তৈরি হয়েছে। মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ, নদীদূষণ রোধ, অভয়াশ্রম সম্প্রসারণ এবং জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা গেলে সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
নদীতে ইলিশের সংকটের প্রভাব পড়েছে বাজারেও। জেলেরা কম দামে মাছ বিক্রি করলেও একাধিক হাত ঘুরে খুচরা বাজারে ইলিশের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ক্রেতাদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত বাজার তদারকি না থাকায় মধ্যস্বত্বভোগীরা সুযোগ নিচ্ছেন। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে ইলিশ।
অন্যদিকে নদীতে সংকট থাকলেও গভীর সমুদ্রে তুলনামূলক ভালো ইলিশ মিলছে। চরফ্যাশনসহ উপকূলের বিভিন্ন ঘাটে প্রতিদিন কোটি টাকার ইলিশ বেচাকেনা হচ্ছে। তবে জেলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় প্রত্যাশিত পরিমাণ মাছ পাচ্ছেন না সবাই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশ শুধু ভোলার অর্থনীতির নয়, জেলার পরিচয়েরও অংশ। তাই নদীর পরিবেশ সংরক্ষণ, আইন বাস্তবায়ন এবং টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে ইলিশের মজুদ আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
যে আই