দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বর্ষা এলেই আতঙ্কে দিন কাটে কক্সবাজারের রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নের পশ্চিম গোয়ালিয়াপালং, দক্ষিণ গোয়ালিয়াপালং ও টাইংগাকাটা এলাকার মানুষের। রেজুখালের পানি ফুলে-ফেঁপে উঠলেই ভেঙে যায় খালের পাড়, আর লবণাক্ত জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ে কৃষিজমি ও বসতবাড়িতে। চোখের সামনে তলিয়ে যায় ধানের ক্ষেত, পানবরজ ও মাছের ঘের। বছরের পর বছর একই দুর্ভোগ চললেও প্রায় ৪ কিলোমিটার স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণে এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের দাবি, রেজুখালের ভাঙা অংশ দিয়ে প্রতিটি জোয়ারে লবণাক্ত পানি কৃষিজমি ও বসতবাড়িতে প্রবেশ করছে। এতে ধান, পানবরজ, সুপারি, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি মাছের ঘেরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে প্রায় এক হাজার কৃষক সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এর প্রভাব পড়ছে কয়েক হাজার মানুষের জীবিকা ও জীবনযাত্রায়।
শুধু কৃষিজমিই নয়, নদীভাঙনের কারণে বিলীনের পথে বহু বছরের পুরোনো বসতভিটাও। স্থানীয়দের ভাষ্য, অন্তত ৩০টি পরিবার বর্তমানে সরাসরি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
কৃষক আব্দুল রশিদ বলেন, "প্রতিবছর একইভাবে ফসল নষ্ট হয়। অনেক কষ্ট করে চাষাবাদ করলেও শেষ পর্যন্ত লাভের বদলে লোকসান গুনতে হয়। একটি স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ হলে কৃষকরা স্বাভাবিকভাবে চাষাবাদ করতে পারবেন।"
৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য সিরাজুল ইসলাম জানান, তাঁদের প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো বসতভিটা একসময় রেজুখাল থেকে প্রায় ৫০০ ফুট দূরে ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর ভাঙনের কারণে খালটি এখন বাড়ির একেবারে কাছে চলে এসেছে। ইতোমধ্যে খালগর্ভে বিলীন হয়েছে বহু গাছপালা, কৃষিজমি ও সম্পদ। বর্তমানে অন্তত ২০টি পরিবার সরাসরি ভাঙনের মুখে রয়েছে। নতুন নির্মিত তাঁর বাড়িটিও এখন খালের কিনারায়।
তিনি বলেন, দ্রুত টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে আসন্ন বর্ষাতেই কয়েকটি বসতভিটা খালগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। সিরাজুল ইসলামের ছেলে মুরশিদুল আলম সোহেল বলেন, তাঁদের পুকুর, অসংখ্য গাছপালা এবং বাড়ির উঠানের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে ভাঙনের কবলে হারিয়ে গেছে। এখন পুরো বসতভিটাই হুমকির মুখে।

স্থানীয় সাবেক ছাত্রদল নেতা মাহাবুব রহমান বলেন, যুগের পর যুগ এই এলাকা অবহেলিত। বর্ষা এলেই মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে যায়। প্রায় ৪ কিলোমিটার স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের একটি প্রস্তাব ইউনিয়ন পরিষদ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে। সরকার দ্রুত বিষয়টি বাস্তবায়ন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক মোবারক হোসেন বলেন, ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করছে। পাশাপাশি খালের পাড়ের একের পর এক বসতবাড়িও ঝুঁকিতে পড়ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে দুই থেকে তিন হাজার পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বন কৃষিজমি রক্ষা করা সম্ভব হবে।
ইউপি সদস্য কবির আহমদ বলেন, প্রতিবছর জোয়ারের পানিতে হাজার হাজার মানুষের কৃষিজমির ফসল নষ্ট হয়। কয়েকটি বাড়ি ইতোমধ্যে ভাঙনের মুখে রয়েছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য একটি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।
রামু উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুশান্ত দেবনাথ বলেন, সাম্প্রতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত তাঁদের মধ্যে সহায়তা বিতরণ করা হবে।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিল্লুর রহমান জানান, তিনি ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং স্থানীয় চেয়ারম্যানকে বিষয়টি সার্বক্ষণিক তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, আগামী বর্ষা মৌসুমের আগেই পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করলে কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও স্থানীয় অবকাঠামো রক্ষা পাবে। অন্যথায় প্রতি বর্ষায় ফসলহানি, নদীভাঙন ও মানবিক দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
কেএম