দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

হাওরের জেলা সুনামগঞ্জের ২৭ লক্ষ মানুষের চিকিৎসা সেবার একমাত্র ভরসার নাম ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতাল। দীর্ঘদিনের চিকিৎসক ও নার্স সংকটে থাকা এই হাসপাতাল এবার নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এক গাইনি চিকিৎসকের বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে।
অভিযোগ উঠেছে, সরকারি অনুমতি ছাড়াই ঈদের ছুটিতে মালয়েশিয়া সফরে গেছেন হাসপাতালের গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. লিপিকা দাস। বিষয়টি হাসপাতালের সেবা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
জানা গেছে, গত ১৬ মার্চ ঈদের ছুটি কাটাতে স্বামীর সঙ্গে মালয়েশিয়ায় যান তিনি। সেখানে প্রায় ছয় দিন অবস্থান শেষে ২১ মার্চ দেশে ফেরেন। তবে এই বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে, যা সরকারি চাকরি বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো সরকারি চিকিৎসক দেশের বাইরে যেতে চাইলে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে স্বাস্থ্যখাতে কর্মরত চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ সম্পূর্ণরূপে নিয়মবহির্ভূত হিসেবে গণ্য হয়।
এছাড়া, কর্মস্থল ত্যাগ বা স্টেশন লিভ গ্রহণের ক্ষেত্রেও যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা এবং অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। এই বিধান লঙ্ঘিত হলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
এদিকে, হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ গাইনি ওয়ার্ডে তার অনুপস্থিতি নিয়ে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অসন্তোষ। অভিযোগ রয়েছে, ঈদের দ্বিতীয় দিন তার রাউন্ড দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন না।
গাইনি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের অনুপস্থিতির কারণে রোগী সেবায় বিঘ্ন ঘটার অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, ঈদের সময় জরুরি সেবা নিতে এসে তারা কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা পাননি।
সুনামগঞ্জের নারায়নতলা এলাকার রহিমা খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলের বউকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলাম। আমার ছেলে অটোরিকশা চালায়। প্রাইভেট ডাক্তার দেখানোর টাকা নাই। হাসপাতালে এসে জানতে পারি ডাক্তার নাই। ছেলেকে ফোন দিয়েছি, টাকা নিয়ে আসলে প্রাইভেটে ডাক্তার দেখাবো।’
ইসমাইল আহমেদ নামে আরেক রোগীর স্বজন বলেন, ‘সুনামগঞ্জে নারী গাইনি চিকিৎসক নাই বললেই চলে। আমার বউ মাদরাসায় লেখাপড়া করায়। সে নারী চিকিৎসক ছাড়া ডাক্তার দেখাবে না। হাসপাতালে এসে শুনলাম তিনি আসেননি। নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসক উপস্থিত না থাকায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা বিলম্বিত হয়েছে। এতে অতিরিক্ত ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে।’
এদিকে এই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এর আগেও নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে— নিয়মিত অফিসে অনুপস্থিতি, নির্ধারিত সময়ের আগেই কর্মস্থল ত্যাগ, এমনকি সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ডা. লিপিকা দাসের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হাসপাতালটি মূলত একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যারা এই সিন্ডিকেটের অন্তর্ভুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলেও কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক সংকটে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি হাসপাতালে দায়িত্বশীল চিকিৎসকের এমন আচরণ জনসেবার প্রতি চরম অবহেলার শামিল। তারা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সুমন বনিক বলেন, ‘ঈদের দ্বিতীয় দিনে তার রাউন্ড দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি কেন উপস্থিত হননি, সে বিষয়ে আমি অবগত নই। অফিস খোলার পর বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মাহবুবুর রহমান স্বপন বলেন, ‘তিনি বিদেশে গেছেন কি না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। তিনি ঈদের ছুটিতে ছিলেন এটুকুই জানি। তবে সরকারি কোনো কর্মকর্তা বিদেশে গেলে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি বাধ্যতামূলক। আমার অনুমতি থাকলেই তিনি দেশের বাইরে যেতে পারেন না।’
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রফিক বলেন, ‘সরকারি চিকিৎসকদের বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া বিদেশ যাওয়া নিয়মবহির্ভূত। এমনকি স্টেশন লিভের ক্ষেত্রেও অনুমতি নিতে হয়।’
/অ