দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বিজয় কুমার জোয়ার্দারের বিরুদ্ধে স্ত্রী নির্যাতন, জোরপূর্বক গর্ভপাত ঘটানো এবং হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় তার কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীসহ মোট পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। আর বিষয়টি সাতক্ষীরার সর্বস্তরের মানুষের মুখে মুখে।
বুধবার (৪ মার্চ) রাতে আশাশুনি থানায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। মামলার বাদী মাগুরা জেলার মাগুরা থানার মালন্দ অঞ্জুরপাড়া গ্রামের গোপাল সরকারের মেয়ে মুক্তি সরকার।
আশাশুনি থানার ওসি শামীম আহমেদ খান জানান, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
মুক্তি সরকার বলেন, বৃহস্পতিবার সাতক্ষীরার জেলা জজ আদালতের অধীন আইন সহায়তা অফিসে আমাদের (স্বামী-স্ত্রী) উভয়কে ডাকা হলে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি সেখানে যান। কিন্তু পাশেই কালেক্টরেট এলাকায় অবস্থান করলেও আদালতের এ আহ্বানে আশাশুনি উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বিজয় কুমার জোয়ার্দার সাড়া দেননি।
মুক্তি সরকার জানান, এ বিষয়ে তিনি জেলা প্রশাসক আফরোজা আখতার ও আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমু তার সব কথা শুনেছেন। আবার প্রশাসনের শীর্ষ দুই কর্মকর্তার কাছে নিরাপত্তা সহায়তা চাইলে তাকে নিরাপত্তায় সবরকম সহায়তার জন্য আশস্ত করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে আশাশুনি উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বিজয় কুমার জোয়ার্দারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে আশাশুনি উপজেলার সমাজকর্মী মো. আলাউদ্দিন বলেন, আইনের মানুষরা হবেন সমাজের কাছে উদাহরণ। অথচ এর বিপরীতে এ ধরনের আইনের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যেসব কদর্য অভিযোগ আসছে তার সদুত্তর থাকা উচিত।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, প্রধান আসামি বিজয় কুমার জোয়ার্দার (৩৭) মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার ছোনগাছা গ্রামের পরিমল কুমার জোয়ার্দারের ছেলে। অন্য আসামিরা হলেন—বিজয়ের কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী ফাগুনী সুমি কাসারী (২৫), মা উষা রাণী জোয়ার্দার (৬৫), বাবা পরিমল কুমার জোয়ার্দার (৭০) এবং ভাই পরিতোষ কুমার জোয়ার্দার (৩২)।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল আদালতের মাধ্যমে বিজয় কুমার জোয়ার্দারের সঙ্গে মুক্তি সরকারের বিয়ে হয়। পরে ২০২২ সালের ৮ অক্টোবর হিন্দু ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী পারিবারিকভাবে তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। সে সময় তারা দুজনই পড়াশোনা করতেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিজয় একটি দরিদ্র জেলে পরিবারের সন্তান হওয়ায় বিয়ের পর সংসারের অধিকাংশ খরচ বহন করতেন মুক্তি সরকার। নিজের উপার্জিত অর্থ স্বামীর হাতে তুলে দিয়ে তিনি সংসার চালাতেন। স্বামীর চাহিদা অনুযায়ী তার পরিবার থেকে স্বর্ণালঙ্কার, টেলিভিশন, ফ্রিজ ও বিভিন্ন আসবাবপত্রসহ প্রায় ৬ লাখ টাকার যৌতুক দেওয়া হয়। এরপরও নিজ গ্রামে বাড়ি নির্মাণের জন্য বিজয় কুমার জোয়ার্দার স্ত্রীর পরিবারের কাছে ৫০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যৌতুক দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে বিভিন্ন সময়ে মুক্তি সরকারের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু হয়। একপর্যায়ে তিনি গর্ভবতী হলে সন্তান নিতে না চাওয়ায় তাকে বারবার গর্ভপাত করতে চাপ দেন স্বামী।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে স্থানীয় চিকিৎসকের মাধ্যমে তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও গর্ভপাত করানো হয়। পরে আরও কয়েক দফা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গর্ভের সন্তান নষ্ট করা হয়, যার ফলে তিনি বর্তমানে সন্তান ধারণে জটিলতার মুখে পড়েছেন।
সন্তানধারণের চিকিৎসার জন্য সম্প্রতি মুক্তি সরকার ভারতের চেন্নাইয়ে যান। অভিযোগে বলা হয়েছে, চিকিৎসার জন্য তার স্বামীও যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন অজুহাতে তিনি সেখানে যাননি এবং পরে স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ করে দেন।
এদিকে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে ফাগুনী সুমি কাসারী নামের এক নারী মোবাইল ফোনে নিজেকে বিজয় কুমার জোয়ার্দারের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে মুক্তিকে তাকে ছেড়ে চলে যেতে বলেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বিজয় কুমার জোয়ার্দারের সঙ্গে ওই নারীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক এবং দ্বিতীয় বিয়ের অভিযোগও আনা হয়েছে।
মুক্তি সরকারের অভিযোগ, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি চেন্নাই থেকে দেশে ফিরে তিনি আশাশুনিতে স্বামীর সরকারি বাসভবনে অবস্থান করছিলেন। সেখানেও আবার ৫০ লাখ টাকা যৌতুকের দাবি জানানো হয়। পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে তাকে বেধড়ক মারধর করা হয় এবং গলা চেপে ধরে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তার চিৎকার শুনে স্থানীয় বাসিন্দা রিপন মন্ডল, নাইটগার্ড মামুন হোসেন, আনন্দ সরকারসহ কয়েকজন দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরে তাকে আশাশুনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
মামলায় আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে একাধিকবার গর্ভপাত ঘটানোর ঘটনার পর অবশেষে আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
এ ঘটনায় আশাশুনি থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ও দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
এবি/