দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

নরসিংদী শহরের মেঘনা নদীর তীর ভক্ত ও পুণ্যার্থীর ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা। শহরের কাউরিয়াপাড়ার শ্রী শ্রী বাউল ঠাকুরের আখড়ায় মাঘী পূর্ণিমা উপলক্ষে শুরু হওয়া সাতশ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই মেলা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং মানবধর্ম, সাম্য ও আধ্যাত্মিক সাধনার এক অনন্য মিলনমেলা।
গত বুধবার থেকে শুরু হওয়া মেলায় ভারতসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েকশ বাউল সাধকের সমাগম ঘটেছে। বাদ্যযন্ত্রের মৃদু তালে, একতারা-দোতারার সুরে আর গানের গভীর দর্শনে আখড়া প্রাঙ্গণ দিন-রাত মুখর। বাউলরা মানুষের ভেতরের মানুষকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে মানবতার জয়গান গাইছেন। তাদের মতে, এই গান শুধুই বিনোদন নয়; এটি শত শত বছর ধরে চলমান আধ্যাত্মিক সাধনার ধারাবাহিকতা।
বাউলরা জানিয়েছেন, আখড়ায় বাউল ঠাকুরের অন্তর্ধান হয়েছিল। আখড়ায় জগন্নাথ দেবতার মন্দির রয়েছে, যেখানে মহাবিষ্ণুর পূর্ণাঙ্গ প্রতিমা, জগন্নাথ দেবতার প্রতিমা, মা গঙ্গার গট, নাগ দেবতার বিগ্রহ এবং শিবলিঙ্গ স্থাপন করা আছে। পাশাপাশি বাউল ঠাকুর ও মাতাজির সমাধি মন্দিরও রয়েছে। আখড়ার কেন্দ্রে একটি বিশাল আটচালা বৈঠক ঘর আছে, যেখানে দেশ-বিদেশের বাউল সাধকরা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মিলিত হন। তবে এটি প্রচলিত অর্থের বৈঠক নয়—এখানে কথা কম, অনুভূব বেশি। সাধকের গাওয়া গানের মর্মার্থ অনুধাবন করাই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য।
বাউল তিশা বলেন, ‘আমাদের গাওয়া গান সাধারণ বাউল সংগীত নয়। এগুলো মানুষের আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণের গান। এই সাধনাই আমাদের পথ দেখায়। আমরা মানুষসহ সর্বজীবের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করি। বিশ্বের সকল মানুষ যেন শান্তিতে থাকে, সেই প্রার্থনা করি। আমরা গানে গানে মানববন্ধন করি।’
মেলায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শত শত নারী-পুরুষ অংশগ্রহণ করেছেন। সবাই আখড়ায় ঘি প্রদীপ, মোমবাতি ও আগরবাতি জ্বালিয়ে মনোবাসনা পূরণে প্রার্থনা করছেন। নিয়মিত অংশগ্রহণকারী কাজল সাহা বলেন, ‘এই মেলা আমাদের শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। যজ্ঞের দিন ঘি বাতি দিয়ে পূজা করি। সারা বছর এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করি। এখানে সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে আসে, এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।’
আরেক ভক্ত আকাশ চক্রবর্তী বলেন, ‘পরিবারসহ ছোট থেকেই মেলায় আসি। এখানে এসে ঘি বাতি জ্বালিয়ে ঠাকুরের কাছে পরিবার ও দেশের কল্যাণে প্রার্থনা করেছি। মেঘনা নদীর তীরে মেলায় ঘুরে আনন্দ উপভোগ করেছি।’
বাউল মেলার তত্ত্বাবধায়ক সাধন চন্দ্র বাউল বলেন, ‘প্রতি বছর মাঘী পূর্ণিমায় এই যজ্ঞের মাধ্যমে সকল জীবজগতের কল্যাণ কামনা করা হয়। আমাদের সাধনা মানুষের মন থেকে মলিনতা দূর করা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সবাই এখানে আসে। এটাই বাউল দর্শনের আসল শক্তি।’
ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরিবেশের পাশাপাশি মেঘনা নদীর তীরে বসেছে রঙিন গ্রামীণ মেলা। নাগরদোলা ও চড়কি শিশু-কিশোরদের আকর্ষণ করছে। সারি সারি দোকানে বিক্রি হচ্ছে মাটির পুতুল, হাড়ি-কলসসহ নানা তৈজসপত্র। মিষ্টির দোকানে জিলেপি, বাতাসা ও গ্রামীণ খাবারের সমারোহ মেলার আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সন্ধ্যা নামলে আলো আর মানুষের কোলাহলে নদীর পাড় যেন উৎসবের শহরে পরিণত হয়।
এই বাউল মেলা কেবল বার্ষিক আয়োজন নয়; এটি নরসিংদীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল। এখানে মানুষ আসে প্রার্থনা করতে, গান শুনতে এবং নিজেদের ভেতরের শান্তি খুঁজে পেতে।
এমএস/