দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের এক ভয়ঙ্কর অপরাধী মো. জালাল উদ্দিন ওরফে সেলিম জালাল। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দেওয়া সেলিমের মূল কাজ প্রতারণা। সম্প্রতি স্যোশাল মিডিয়ায় এই প্রতারকের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
স্যোসাল মিডিয়া বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিগত কয়েক বছর ধরেই এই মানব পাচারকারী শতশত মানুষকে বিভিন্ন পন্থায় মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মালয়েশিয়ায় নিয়ে আসেন। এরপর তাদের কাছ থেকে আরো টাকার জন্য বন্দি করে রাখেন। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য এক পর্যায়ে অনেকে নিজের শেষ সম্বল ভিটেবাড়িও বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছে। মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নেয়া বন্ধ থাকায় সম্প্রতি মানব পাচার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য আরো বেড়েছে। ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড হয়ে নদীপথ আর জঙ্গল দিয়ে মালয়েশিয়াতে মানুষ ঢুকাচ্ছে পাচারকারীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভুক্তভোগী জানান, এসব মানব পাচারের হোতা এই সেলিম জালাল। এছাড়া ভিসা নবায়ন করে দেয়ার নামেও শতশত মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভিসা না করে ভুক্তভোগীদের নানান ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। এই সেলিমের কারণে এরকম শতশত মানুষ এখন মালয়েশিয়ার বিভিন্ন জঙ্গলে থাকছে, ভয়ংকর সাপ ও বন্যপ্রাণীর সাথে।
ভুক্তভোগী সবুর মন্ডল বলছেন, ‘আমি এ্যাহোন না খাইয়া জঙ্গলে থাকি কারণ এই সেলিম জালাল। আল্লাহ কি এর বিচার করবো না। আমাদের ভিসার টাকা মেরে দিয়ে আমাদেরকে অবৈধ করে দিছে এই জালাল। আমার মত শতশত মানুষ কষ্টে আছে এই টিচারের কারণে। মানব পাচারে মালয়েশিয়াকে নরক বানিয়ে দিছে এরা।’
গোলাম নামের আরেকজন তার স্যোসাল মিডিয়াতে বলেছেন, ‘সেলিম জালাল নামে কুমিল্লার এই লোকের কারণে আমার মত কয়েকশ মানুষ আজকে মালয়েশিয়ার জঙ্গলে লুকিয়ে আছে। ভিসা করে দেয়ার জন্য আমাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভিসা করে দেয়নি। হেই জন্য এখন আমরা অবৈধ। কোন কাজ নেই, তাই আমরা খাইতেও পারিনা। এম্বাসিকে বলছি, বাটপার এই লোকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।’
রহম আলী লিখেছেন, ‘আমার পরিচিত অনেকে এই সেলিম জালালের কারণে অবৈধ হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, আর এই চিটার নাকি বুকিত বিনতাংয়ে ঘুরে বেড়ায়।’
কবির খান নামের আরেক মালয়েশিয়া প্রবাসী বলেছেন, ‘মালয়েশিয়ায় আজ আমি অবৈধ কারণ এই আওয়ামী লীগের সেলিম জালাল। আমার মত হাজারো মানুষ আজ ধুঁকে ধুকে মরছে, এই লোকের কারণে। আমি এর বিচার চায়। দয়া করে আমার পাশে দাঁড়ান এই কথা আমাদের সরকারের কাছে পৌঁছে দেবেন।’
প্রবাসী এসব শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ায়ে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সোশ্যাল প্লাটফর্ম জুলাই রেভ্যুলেশনারি অ্যালায়েন্স (জেআরএ) বলেছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কথিত সাধারণ সম্পাদক সেলিম জালালের কারণে শতশত মানুষ অবৈধ হয়ে আজ মালয়েশিয়ার জঙ্গলে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
২০১৫ সালেও এই সেলিম খেতে পেত না। কুয়ালালামপুরের বিভিন্ন মানুষের কাছে সাহায্য চেয়ে চলতো। এরপর মালয়েশিয়ান নারীকে বিয়ে করে চাঁদাবাজি অপহরণের মতো ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। সর্বশেষ কলিং ব্যবসার প্রতারণা করে শতশত অসহায় মানুষের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। জুলাই আন্দোলনের প্রত্যাশা মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশনার এই প্রতারকের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে, প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াবে, তাদেরকে বাঁচাবে।
মানবপাচারকারী সেলিম জালাল নিজেকে ব্যবসায়ী পরিচয় দিলেও আদৌতে তার কোন বৈধ ব্যবসা নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মানবপাচার ছাড়াও নানান অবৈধ কাজের হোতা এই সেলিম। কিন্তু তার চলাফেরা দামি পোশাক ভাড়া করা জার্মানির বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গাড়ি এসব দেখিয়ে গত কয়েক বছরে অন্তত ১৭ জন ব্যক্তির কাছ থেকে নানান পন্থায় মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। যার কোনটিই কোটি টাকার কম নয়। তথ্য বলছে কারও কারও কাছ থেকে নেয়া টাকার হিসাব কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত।
ভুক্তভোগীরা বলেছেন, মালয়েশিয়াতেই কয়েকটি বিয়ে করা সেলিম একাজে নিজের স্ত্রীদের ব্যবহার করে। তার এই প্রতারণার ফাঁদে যুক্ত স্ত্রীর লাইফস্টাইল যেকোনো রাজপরিবারের সদস্যদের সাথে তুলনা করা যায়।
ভুক্তভোগীরা জানান, সেলিমের স্ত্রী নিতান্তই গরিব ঘরের সন্তান, এমনকি তার বাবা-মায়ের তিনবেলা ঠিকমতো খাবার খাওয়ার মত সাধ্য নাই। কিন্তু তারা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পোশাক পরে। এদের হাতে একদিকে প্রবাসী শ্রমিকরা অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা প্রতারিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এ ব্যাপারে মতামত জানতে সেলিমকে কয়েকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরণের প্রতারকের মানুষকে হিপটোনাইজ করার অসাধারণ ক্ষমতা থাকে, সেকারণে এরা খুবই বিপজ্জনক। সমাজে এদের উপস্থিতি একটি কমিউনিটির স্বাভাবিক বিকাশের পথে বড় বাধা। সহযোগীসহ এদেরকে সমাজ থেকে আলাদা করতে হবে, সেই সাথে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন যাতে আর কেউ এমন পন্থায় মানুষকে শোষণ ও প্রতারণা করতে না পারে বলেও মন্তব্য করেন বিশ্লেষকরা।
হাই কমিশন থেকে জানানো হয়েছে তার ব্যাপারে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয় দেয়া সেলিমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
এবি/