দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

সুদানের আবেই অঞ্চলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের একটি ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের ভয়াবহ হামলায় নিহত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছয় শান্তিরক্ষীর দুইজনের বাড়ি কুড়িগ্রামে। শান্তিরক্ষায় প্রাণ উৎসর্গ করা এই দুই বীর সেনাকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ পুরো কুড়িগ্রাম। কান্নায় ভেঙে পড়েছে পরিবার, স্বজন ও গ্রামবাসী। নিহত দুই সেনাসদস্যের বাড়িতে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেছে।
এর আগে শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের আওতাধীন একটি ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীরা আকস্মিক হামলা চালায়। হামলার সময় ঘাঁটির ভেতরে ও আশপাশের এলাকায় তীব্র গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের ছয় সদস্য শহীদ হন এবং অন্তত আটজন আহত হন।
সেনাবাহিনীর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক পোস্টে জানানো হয়, শনিবার স্থানীয় সময় দুপুর আনুমানিক ৩টা ৪০ মিনিট থেকে ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত কাদুগলি লজিস্টিক বেসে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী ড্রোন হামলা চালায়। ওই হামলায় দায়িত্ব পালনরত ছয়জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী শহীদ হন।
সেনাবাহিনী প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী শহীদ শান্তিরক্ষীরা হলেন— কর্পোরাল মো. মাসুদ রানা, এএসসি (নাটোর), সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম, বীর (কুড়িগ্রাম), সৈনিক শামীম রেজা, বীর (রাজবাড়ী), সৈনিক শান্ত মন্ডল, বীর (কুড়িগ্রাম), মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (কিশোরগঞ্জ) এবং লন্ড্রি কর্মচারী মো. সবুজ মিয়া (গাইবান্ধা)।
নিহত শান্তিরক্ষী সৈনিক শান্ত মন্ডল (২৬) কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের সাটমাধাই ডারারপাড় গ্রামের বাসিন্দা। তিনি সাবেক সেনাসদস্য (মৃত) নুর ইসলাম মন্ডলের ছেলে। তার মা সাহেরা বেগম। বড় ভাই সোহাগ মন্ডলও সেনাবাহিনীতে কর্মরত, বর্তমানে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ল্যান্স কর্পোরাল পদে রয়েছেন।
রোববার দুপুরে শান্ত মন্ডলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে বাকরুদ্ধ মা সাহেরা বেগম বিছানায় বসে আছেন। বড় ভাই সোহাগ মন্ডলের চোখ লাল হয়ে আছে অঝোর কান্নায়। স্বজন ও প্রতিবেশীরা একের পর এক এসে শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।
সোহাগ মন্ডল জানান, শান্ত ২০১৮ সালে সৈনিক পদে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সর্বশেষ তিনি বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন। গত ৭ নভেম্বর শান্তিরক্ষী মিশনে সুদানে যান।
তিনি আরও বলেন, ‘গত এক বছর আগে শান্ত বিয়ে করে। তার স্ত্রী বর্তমানে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সন্ধ্যায় শান্ত ভিডিও কলে পরিবারের সবার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে জানতে পারি ওদের ক্যাম্পে হামলা হয়েছে। পরে নিশ্চিত হই, শান্ত আর নেই। আমরা এখন তার লাশের অপেক্ষায় আছি। বাবার কবরের পাশেই তাকে দাফন করতে চাই।’
মাত্র ৩৩ দিন আগে মিশনে গিয়েছিলেন।
সন্ত্রাসী হামলায় নিহত আরেক শান্তিরক্ষী সৈনিক মমিনুল ইসলাম, বীর (৩৮) কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার পান্ডুল ইউনিয়নের পারুলেরপাড় গ্রামের বাসিন্দা। তিনি আব্দুল করিমের ছেলে। তার পরিবারে বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই কন্যা রয়েছে। বড় মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে, ছোট মেয়ের বয়স মাত্র চার বছর।
জানা গেছে, মাত্র ৩৩ দিন আগে শান্তিরক্ষী মিশনে সুদানে যান মমিনুল। শনিবার বিকালে ভিডিও কলে পরিবারের সবার সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলেন তিনি। রাত আনুমানিক ১১টার দিকে তার মৃত্যুর খবর পৌঁছায় পরিবারে।
মমিনুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকের মাতম চলছে। স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রী ও মা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। প্রতিবেশী ও স্বজনরা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
মমিনুলের বাবা আব্দুল করিম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলে খুব ভালো মানুষ ছিল। এলাকার সবাই তাকে ভালোবাসত। আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন বলেই হয়তো শহীদের মর্যাদা দিয়েছেন। এখন শুধু তার লাশের অপেক্ষায় আছি।’
দুই বীর সন্তানের মৃত্যুতে কুড়িগ্রামের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে শোক আর বেদনায়। প্রাণ উৎসর্গ করা এই শহীদদের স্মরণে পুরো জেলায় নেমে এসেছে গভীর নীরবতা।
এবি/