দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

কাঁধে ঝোলানো কাপড়ের ব্যাগ, ব্যাগের ভেতরে দা, চাকু, স্কেল আর করাত। বাম হাতের কাঁধের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা ভারি ওজনের খুন্তি আর ঘোড়ার লাগাম। ডান হাতে চাবুক। টগবগ টগবগ করে চলছে ঘোড়া। এলাকার কারও মৃত্যুর খবর পেয়ে কবর খুঁড়তে এভাবেই ছুটে চলেন মনু মিয়া। বয়সের ভারে বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থতায় জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ঢাকার একটি হাসপাতালে বৃহস্পতিবার (১৪ মে) থেকে চিকিৎসাধীন মনু মিয়া। এই অসুস্থতার মাঝেই মনু মিয়ার একমাত্র সঙ্গী ঘোড়াটিকে মেরে ফেলেছে দুবৃর্ত্তরা।
কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি ইউনিয়নের আলগাপাড়া গ্রামের ৭০ বছরের বৃদ্ধ মনু মিয়ার ঘোড়ায় ছুটে চলা দেখলেই যে কেউ বুঝতে পারেন নিশ্চিত কারও মৃত্যু হয়েছে। দাফনের সময় জেনে প্রয়োজনীয় সব ধরনের যন্ত্রপাতি নিয়ে মৃতের বাড়িতে ছুটে যান তিনি। মৃতের বাড়িতে গিয়ে বাঁশ কাটা থেকে শুরু করে নিপুণ হাতে কবর খোঁড়ার কাজ করেন মনু মিয়া। দাফন শেষ করে বাড়ি ফিরেন তিনি। এজন্য নেন না কোনো পারিশ্রমিক। এমনকি ওই বাড়ির কোনো খাবারও তিনি গ্রহণ করেন না।
নিম্ন-মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের সন্তান মনু মিয়ার মা সারবানুর মৃত্যু হয় ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ। মায়ের কবর তৈরিতে অংশ নেন কিশোর মনু মিয়া। সেই থেকে শুরু। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে নিজের টাকা খরচ করে কবর খুঁড়েন। বাবার জমি বিক্রি করে ঘোড়া কিনেছেন। যন্ত্রপাতি তৈরিতে খরচ হয়েছে লাখ টাকা। সংসার চলে টেনেটুনে। এতে কোনো কষ্ট নেই তার। এলাকায় বা আশপাশে কারও মৃত্যু হলে ঘোড়ায় চড়ে যান কবর তৈরি করতে। আর দূরে কোথাও হলে গাড়িতে যান। আর নিজে লেখাপড়া না জানলেও অন্য লোক দিয়ে প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনায় নাম, ঠিকানা ও কবরের সংখ্যা লিখে রাখেন হিসেবের খাতায়। কিশোরগঞ্জ ছাড়াও ঢাকা-সিলেট-সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে কবর খুঁড়েছেন তিনি। তার ডায়েরিতে লিখে রাখা হিসেব মতে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৫৭ জনের কবর খুড়েছেন মনু মিয়া। এর মধ্যে রয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকাসহ বিশিষ্টজনদের কবর।
কবর খুঁড়তে দূরের যাত্রায় দ্রুত পৌঁছাতে নিজের জমি বিক্রি করে কয়েক বছর আগে ঘোড়াটি কিনেছিলেন মনু মিয়া। মনু মিয়ার অসুস্থতায় তার বাড়িতে মানুষের অনুপস্থিতিতে ঘোড়াটি একা হয়ে পড়ে। শুক্রবার (১৬ মে) সকালে পাশের উপজেলা মিঠামইনের হাশিমপুর গ্রামের একটি মাদরাসার পাশে পানির মধ্যে ঘোড়াটির মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন এলাকাবাসী। ঘোড়াটির বুকে ধারালো অস্ত্রের আঘাত। গুরুতর অসুস্থ চিকিৎসাধীন মনু মিয়ার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথা ভেবে স্ত্রী ও স্বজনেরা ঘোড়ার মৃত্যুর খবর গোপন করে রেখেছেন।
মনু মিয়া স্ত্রী রহিমা বেগমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ হলে তিনি জানান, মনু মিয়াকে তাড়াতাড়ি করে ঢাকা নিয়ে আসলে ঘোড়াটিকে দেখার মতো কেউ ছিল না। হয়তো রশি ছিঁড়ে চলে গেছে এখন খবর পেয়ে ঘোড়াটাকে মেরে ফেলেছে। তার (মনু মিয়া) কাছে ঘোড়াটা সন্তানের মতো ছিল। নিজের থেকে বেশি আদর যত্ন করেছে। আমরা এর বিচার চাই।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপারের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মুকিত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ামাত্রই প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মনু মিয়ার একমাত্র বাহন ঘোড়া হত্যার ঘটনায় নিন্দার ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেখানে নেটিজেনরা এই ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এছাড়াও মনু মিয়ার সুস্থতা ও আশু রোগমুক্তি কামনা করছেন অনেকে। তাকে তার বাহন ঘোড়া উপহার দিতেও চান অনেকে।
সবার প্রিয় একজন নিঃস্বার্থ পরোপকারী ও নির্লোভ মানুষ মনু মিয়া দ্রুত সুস্থ হয়ে আবারও তার প্রিয় ঘোড়ায় করে ছুটে যাবেন শেষ ঠিকানার কাজে এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
আরএ