দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

আব্দুল হাকিম পিন্টু নামে এক ব্যাক্তিকে গত ১২ জানুয়ারি কুপিয়ে আহত করা হয়। তিনি আইনশৃঙ্খাবাহিনীর সোর্স ছিলেন। তার নামে একাধিক মাদক মামলাও ছিল। এসব মামরায় একাধিকবার কারাগারেও গেছেন তিনি। ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। ভরতের সীমান্ত ঘেষা ওই ইউনিয়নটি মাদকের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত। তার পিতার নাম মো. হুমায়ন। তিনি চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের গোয়ালডুবী মোল্লাপাড়ার বাসিন্দা।
ওই রাতে আহত আব্দুল হাকিম পিন্টুকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেয়া হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ১০দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ছাড়পত্র দেয়। বাড়িতে নিয়ে আসা হয় পিন্টুকে। বাড়িতে একদিন থাকার পর তাকে আবারো ২৪ জানুয়ারি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই মৃত্যু হয় তার। এই মৃত্যু নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ধুম্রজাল। ঘটনার খবর পেয়ে থানা পুলিশের পক্ষে তার পরিবারকে বারবার মামলা দেওয়ার কথা বলা হলেও এজাহার নিয়ে আসেনি। তবে আহত পিন্টুর মৃত্যুর পর তার বাবা বাদি হয়ে গত ২৫ তারিখ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
কিন্তু আসামির তালিকা দেখে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, সাজানো ছকে পিন্টুর ওপর হামলা করা হয়। মত্যু নিয়েও রয়েছে রহস্য। মামলাও পরিকল্পিত। চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর আলী ও উপজেলা তাঁতী লীগের সভাপতি নরুল ইসলাম মেম্বার পরিকল্পিতভাবে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মামলায় ফাঁসিয়েছ। আওয়ামী লীগ নেতা ওমর আলী ও নুরুল ইসলাম আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আব্দুল ওদুদের অনুসারি ছিলেন। নুরুল ইসলাম মেম্বার মাদকের অন্যতম গডফাদার। এক বিএনপি নেতার প্রশ্রয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর সুযোগ পেয়েছে।
তবে পুলিশ বলছে, তদন্তে সব পরিষ্কার হবে। মৃত্যুর কারণও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে জানা যাবে। প্রকৃত অপরাধীরাই আইনের আওতায় আসবে।
মামলার এজাহারে নিহত পিন্টুর বাবা মো. হুমায়ন উল্লেখ্য করেছেন, গত ১২/০১/২০২৫ ইং তারিখ রাত অনুমান সাড়ে ৭টার সময় পূর্বশত্রুতার জেরে ধরে চরবাগডাঙ্গা বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে জোরপূর্বক দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে তার ছেলেকে আমবাগানে নিয়ে যায়। ১নং আসামি অর্থৎ ইউপি চেয়ারম্যান শহীদ রানা টিপুর হুকুমে ২নং আসামি অর্থাৎ মোবারক হোসেন গুধার ডান হাতে থাকা ধারালো হাসুয়া দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে তার ছেলের মাথায় কোপ মেরে জখম করে। অথচ, মামলার এজাহার নামীয় ২০ আসামির কার সঙ্গে পূর্বশত্রুতা তা উল্লেখ করা হয়নি। ২নং আসামির হাতে থাকা ধারালো হাসুয়ার দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে ভিকটিমের মাথায় কোপ মারার কথা বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ২নং আসামি মোবারক হোসেন গুধার ডান হাত অক্ষম। তিনি প্রতিবন্ধী। কাউকে আঘাত করা তার পক্ষে অসম্ভব।
মামলার আসামির তালিকায় থাকা বিএনপি নেতা আজিজুল ইসলাম বলেন, পিন্টু ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর আলীর লোক হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে তার হয়ে মাদক বহন করেন। উপজেলা তাঁতী লীগের সভাপতি চিহ্নিত মাদক কারবারি নুরুল ইসলামেরও মাদক বহন করতেন তিনি। তবে কিছুদিন আগে নুরুলের হেরোইন নিয়ে আটক হন পিন্টু। এরপর থেকে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। পরিকল্পিতভাবে মতিউর রহমান মতি নামে আরেক সোর্স তাকে আম বাগানে নিয়ে যায়। এবং কয়েকজন মিলে কুপিয়ে আহত করে। ওই আসামিও গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আসল রহস্য পাওয়া যাবে বলে দাবি করেন আজিজুল ইসলাম।
এ মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর আলীর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ইউপি চেয়ারম্যান শহীদ রানা টিপুকে। তিনি আওয়ামী লীগ নেতা ও নৌকা প্রতিকের প্রার্থী ওমর আলীকে হারিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে পরপর দুইবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
ইউপি চেয়ারম্যান শহীদ রানা টিপু বলেন, আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আব্দুল ওদুদ আমাকে অন্যায়ভাবে তিনটি হত্যা মামলায় জড়িয়েছে। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যূত্থানে আব্দুল ওদুদ এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেলেও চরবাগডাঙ্গায় আওয়ামী লীগ নেতরা বহাল তবিয়তে। তারাই পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আমাকে অন্যায়ভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে। সঠিক তদন্ত হলে আওয়ামী লীগ ও তাঁতী লীগ নেতা যে হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড সেটি বেরিয়ে আসবে।
চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর আলী বলেন, পিন্টু আমার লোক ছিল। যারা আসামি হয়েছে তারা আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এটাও ঠিক। কিন্তু এ মামলায় আমার কোনো হাত নেই। নিহত পিন্টুর বাবা এই মামলা করেছে। কেন তাদের আসামি করা হয়েছে তিনিই ভালো বলতে পারবেন।
আব্দুল হাকিম পিন্টু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া একমাত্র আসামি মতিউর রহমানকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। মঙ্গলবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল মাজিস্ট্রেট (সদর) মো. আশরাফুল ইসলাম এ রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আদালত পুলিশের পরিদর্শক সুকোমল চন্দ্র দেবনাথ বলেন, সকালের দিকে মতিউর রহমানকে জেলা কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। আব্দুল হাকিম পিন্টু হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার এসআই মো. আসাদুজ্জামান।
তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আসাদুজ্জামান বলেন, আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর মঙ্গলবার বিকেল তিনটার দিকে তাকে থানায় আনা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এখনই কিছু বলা যাবে না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রইস উদ্দিন বলেন, ১২ই জানুয়ারি ঘটনার দিনই খবর পেয়ে পরিবারের লোকদের থানায় ডাকা হয়েছিল কিন্তু তারা আসেননি। তবে ভিকটিম আব্দুল হাকিম পিন্টু মারা যাওয়ার পর তার বাবা বাদি হয়ে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। একজনকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে আনা হয়েছে। ওসি বলেন, তদন্তে সব পরিষ্কার হবে। মৃত্যুর কারণও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে জানা যাবে। প্রকৃত অপরাধীরাই আইনের আওতায় আসবে।
এফএইচ/