দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

নতুন ফসল ঘরে তুলতে শস্য দেবতা মিসি সালজংকে উৎসর্গ করে পালিত হলো গারো সম্প্রায়ের প্রধান উৎসব ওয়ানগালা। নাচ-গান ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর মধ্য দিয়ে নতুন ফসল ঘরে তুলেছেন মৌলভীবাজারের ক্ষুদ্র-নৃ-তাত্বিক গারো জনগোষ্ঠী। গারোদের বিশ্বাস, প্রভু আশির্বাদ করলে পরের বছরও ভাল ফলন হবে। আর এ আয়োজনকে ঘিরে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষসহ নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরও মেলবন্ধন ঘটে। ধর্মীয় আচার, বন্ধনা ও প্রার্থনা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করতে গারো সম্প্রদায়ের লোকজন ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও জাতি গোষ্ঠীর লোকজন ঐতিহ্যবাহী এই ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপভোগ করতে নানা স্থান থেকে ওখানে উপস্থিত হন।
অনুষ্ঠানে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য খ্রিস্টভক্ত এবং গারাগানজিং, কতচু, রুগা, মমিন, বাবিল, দোয়াল, মাতচি, মিগাম, চিবক, আচদং, সাংমা, মাতাবেং ও আরেং নামে ১২টি গোত্রের গারো স¤প্রদায়ের লোকজন উপস্থিত ছিলেন।
ধর্মীয় রীতিনীতির উৎসব ‘ওয়ানগালা। গারোদের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উৎসব এটি। পাহাড়ের পাদদেশে চা বাগান খেলার মাঠে ব্যতিক্রমী নানা অনুষ্ঠানে ধর্মীয় আচার পালনে ওয়ানগালা উদ্যাপনের আয়োজন ছিল চোখ ধাঁধানো। সকাল থেকেই জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালাপুর ইউনিয়নের ফুলছড়া গারো লাইনের খেলার মাঠে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বিরামহীন ভাবে চলে নানা অনুষ্ঠান। শিক্ষার্থী সালছিনা, থাং সুয়া, কিলি আশকরা, বেবিনা রং দি সহ অনেকেই দেবতার সন্তুষ্টির পাশাপাশি এই আয়োজনের উদ্দেশ্য। এছাড়া আমাদের ভাষা-সংস্কৃতিকে জাগ্রত রাখা। নতুন প্রজন্মকে এ সম্পর্কে জানানো আর এই সঙ্গে সবার একই স্থানে, একই উদ্দেশ্যে মিলিত হয়ে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করা।
গারো সম্প্রদায়ের লোকজন জানান,তাদের নিজস্ব রীতি সংস্কৃতি ধারণ করেই নতুন ফসল ঘরে তোলার উৎসব। অগ্রহায়নের শুরুতেই গারো নবান্ন উৎসবে নতুন ফসলের জন্য গারো সম্প্রদায়ের শস্য দেবতা মিসি সালজংকে ফসল উৎসর্গের এই আয়োজন। সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা হিসেবেই সারা দিন পূজা-অর্চনার মাধ্যমে নেচে-গেয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে দিনটি উদযাপনে তারা নতুন পোশাক পরেন, আত্মীয়-স্বজন-বন্ধুরা একত্রিত হন, বাড়ি-বাড়ি চলে অতিথি আপ্যায়ন।গারো সম্প্রদায় প্রকৃতি পুজারী হলেও অনেকেই খ্রিষ্টান ধর্মে দিক্ষীত। কিন্ত তারা তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে চায়। দেবতার সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় শস্য দেবতাকে তুষ্ট করতেই বছরে একবার এমন আয়োজন বলে জানান ভক্তরা।
ওয়ানগালা উদযাপন কমিটি, সাধারণ সম্পাদক, শামল জোসেফ হাজং জানান,নতুন ফসল তোলার পর এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। এর আগে গারোদের নতুন খাদ্যশস্য ভোজন নিষেধ থাকে। তাই অনেকেই একে নবান্ন বা ধন্যবাদের উৎসবও বলে থাকেন। তিনি আরো বলেন ওয়ানা শব্দের অর্থ দেবদেবীর দানের দ্রব্যসামগ্রী আর গালা শব্দের অর্থ উৎসর্গ করা। এটি গারোদের ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। তবে গারোদের কাছে ওয়ানগালার মূল বিষয়টি ধর্মীয়। পূজা-অর্চনার মাধ্যমে দেবদেবীদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও নানা আবেদন-নিবেদন করা হয় এ-উৎসবে। মিসি সালজং বা সূর্যদেবতার নামে তারা এই অনুষ্ঠান ও আয়োজন উৎসর্গ করেন।
একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যসহ সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্রের মঙ্গল কামনা করা হয় শস্যদেবতার কাছে। অনুষ্ঠানস্থলে বাহারি পোশাকে গারো সমপ্রদায়ের লোকজন নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জানান দেন। অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চের এক জায়গায় গোল করে ঝুড়ির মধ্যে রাখা হয় জমি থেকে তুলে আনা নানা জাতের নতুন ফসল। সৃষ্টিকর্তার নামে এই নতুন ফসলগুলো উৎসর্গ করার পাশাপাশি নিজস্ব সংস্কৃতির নাচগান ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে গারো জনগোষ্ঠী পালন করেন তাদের ঐতিহ্যবাহী উৎসব ওয়ানগালা।
গারো সম্প্রদায়ের লোকজনের তথ্য মতে,ওয়ানগালা তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাৎসরিক উৎসব।ওয়ান শব্দের অর্থ দেবদেবীর দানের দ্রব্যসামগ্রী আর গালা শব্দের অর্থ উৎসর্গ করা। শস্য দেবতার কাছে কৃতঞ্জতা প্রকাশ ও মনোবাসনার নানা নিবেদন হয় এ উৎসবে।
এফএইচ