দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

২০০৫ সালের কোনো একদিন। মা শিশু ইয়াছমিনকে বিছানায় রেখে পাশের বাড়িতে পানিতে আনতে যায়। তখন চৌকির পাশে থাকা কোরোসিনের বাতি থেকে মশারিতে আগুন ধরে যায়। ওই আগুনে শিশু ইয়াছমিনের দুই পা দগ্ধ হয়। পরে ডাক্তারের পরামর্শে তার বাম পা কেটে ফেলতে হয়। রগ পুড়ে ডান পাও অনেকটা শীর্ণ হয়ে যায়। শুরু শিশু ইয়াছমিনের জীবন যুদ্ধ। জীবন সংগ্রামে বড় হতে থাকে সে।
দিনমজুর বাবার অভাবের সংসার। কৃত্রিম পা লাগানোর সামর্থ নেই। ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটা শুরু শিশু ইয়াছমিন অক্তারের। যখন বড় হতে থাকে তখন সে দেখে তার আশপাশের শিশুরা খেলছে, স্কুলে যাচ্ছে। একটা পর্যায়ে সে তার মা-বাবাকে স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য বায়না ধরে। মেয়ের অদম্য শক্তির কাছে হেরে গিয়ে ভর্তির করানো হয় স্থানীয় পশ্চিম গাংচিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর জীবনের বিশটি বসন্ত পার হয়ে গেছে। ইয়াছমিন এখন দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী। ইায়াছমিন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরএলাহী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের গাংচিল গ্রামের দিনমজুর নুর নবীর মেয়ে। ইয়াছমিন এক পায়ে ক্র্যাচে ভর দিয়ে প্রতিদিন ৩ কিলোমিটার পথ হেঁটে নিয়মিত কলেজে যায়।
দেড় বছর বয়সে এক পা হারিয়ে বাস্তবতার জীবনের কঠিন সংগ্রামে দমে যায়নি ইয়াছমিন। দারিদ্রতা আর শারীরিক অক্ষমতাকে জয় করে সে এখন জেলার সদর উপজেলার ড. বশির আহমদ কলেজে দ্বাদশ শ্রেণির দ্বিতীয় বর্ষের মানবিক বিভাগে পড়ছেন। প্রথমে ভর্তি হন স্থানীয় পশ্চিম গাংচিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়ে গাংচিল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। বর্তমানে দেড় কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে প্রথমে স্থানীয় গাংচিল বাজারে যান। পরে সেখান থেকে গাড়ি করে সাড়ে ১৩ কিলোমটিার দূরে পাশের উপজেলার ড. বশির আহমদ কলেজে ক্লাস করছেন নিয়মিত। কলেজ ছুটির পর আবার গাড়িতে করে প্রথমে বাজারে, তারপর বাড়ি ফিরতেও তাকে হাঁটতে হয় দেড় কিলোমিটার পথ। এভাবে বয়ে চলেছেন জীবনের ভার। বছরে ৫ হাজার টাকা প্রতিবন্ধী সরকারি ভাতা পান। কিন্তু সরকারের এ সহযোগিতা একেবারেই অপ্রতুল।
ইয়াছমিন আক্তার বলেন, অনেক কষ্ট করে আমি লেখা পড়া করছি। পড়া লেখা শেষ করে আমি শিক্ষক হতে চাই। সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতায় একটি কৃত্রিম পা সংযোজন হলে আমার স্বপ্ন পূরণ সহজ হবে।
ইয়াছমিনের বাবা নুরনবী বলেন, আমি একজন দিনমজুর। শত কষ্ট-যাতনা সহ্য করে হলেও মেয়েকে লেখাপড়া করাব। মেয়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য একটি কৃত্রিম পা দরকার। এই কৃত্রিম পা ও সংযোজনের জন্য অনেক টাকার দরকার। যা আমার সামর্থের বাইরে। সমাজের বিত্তবান মানুষ এগিয়ে আসলে আমার মেয়ের স্বপ্ন পূরণ হবে।
ড. বশির আহমদ কলেজের প্রভাষক এ.এইচ তানিম বলেন, আমরা তার কষ্টকে মূল্যায়ন করি। একইসঙ্গে তার চেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই। কেননা ইয়াছমিন যেটা সম্ভব করে চলেছেন তা সবার কাছেই অনুপ্রেরণা ও দৃষ্টান্ত।
একই কলেজের অধ্যক্ষ আঞ্জুমান আরা মুক্তা বলেন, ইয়াছমিন প্রতিদিন তিন কিলোমিটার পথ এক পায়ে হেঁটে কলেজে আসে। সে একজন জীবন সংগ্রামী তরুণী। অদম্য প্রচেষ্ঠায় তার গল্পটি হয়ে উঠেছে প্রেরণার। দিনমজুর বাবা সব কিছু হারিয়ে মেয়েকে সারিয়ে তুললেও স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতে পারেনা সে। তাদের আকুতি যদি কৃত্রিম পা দিয়ে হাঁটত পারত ইয়াসমিন। এ জন্য সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।
এফএইচ