দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

সরকারিভাবে কোনো বালুর মহাল নেই। কিন্তু বান্দরবানের রুমা উপজেলার সাঙ্গু নদী থেকে প্রকাশ্যে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রি চলছে। এর ফলে নদীর তীরবর্তী পরিবেশ ও ব্যক্তি মালিকানাধীন ফসলি জমি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বালু উত্তোলনের কারণে পরিবেশ প্রতিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে সরকার বঞ্চিত হলেও প্রশাসন এ ব্যাপারে কোনো আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন মহলকে ‘ম্যানেজ’ করেই এই তৎপরতা চালানো হচ্ছে। তবে প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন ব্যবস্থা নেবেন।
সরেজমিনে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় পরিদর্শনে দেখা যায়, রুমা উপজেলা সদর থেকে মুনলাইপাড়া যাওয়ার পথে ২কিলোমিটার এলাকায় সাঙ্গু নদীর মাঝখানে খনন যন্ত্র বসিয়ে অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে।
গত দুই মাস ধরে রাস্তার ধারে প্রকাশ্যে এই বালু তোলছেন সদর ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু বক্কর।
এ সময় কথা হলে কয়েকজন শ্রমিক ও স্থানীয় পথচারীরা জানান, বক্কর মেম্বার ছাড়াও হাছন মুরাদ, ছাত্রলীগ নেতা নাহিদ মো. শাকিল, প্রণয় লাল চক্রবর্তী যৌথভাবে বালু তোলছেন ওই পয়েন্টে।
এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে ইউপি মেম্বার আবু বক্কর বলেন, আমার বক্তব্য বহু পত্রিকায় উঠেছে। সেখান থেকে দেখে লিখে দেন আমি বালু তুলছি। এছাড়া বালুর বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। তবে বালু মহাল ইজারা হলে সরকার রাজস্ব পেত স্বীকার করেন তিনি।
এই বালুর পয়েন্ট পার হয়ে অল্প কিছুদূর পর রুমা খালের মুখ এলাকায় স্কেভেটর দিয়ে ট্রাকে বালু তুলতে দেখা যায়। সাঙ্গু নদীতে খনন যন্ত্র বসিয়ে পরিবহন সুবিধার্থে প্রায় ৫০০ ফুট দূরত্বে পাইপ লাইন টেনে নেওয়া হয়েছে প্রধান সড়কের পাশে। পানির সঙ্গে সেখানে বালুর স্তুপ তৈরি করা হচ্ছে।
এই পয়েন্ট থেকে বালু তুলছেন সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. দস্তগীর, বিএনপি নেতা আবদুল মোতালেব, জিপ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জুয়েল দাশ ও সহ-সভাপতি মিল্টন মার্মা।
এ সময় এই প্রতিবেদক বালুর স্তুপের ছবি তুলতে গেলে নদীতে চলা খনন যন্ত্র বন্ধ করে দেন শ্রমিকরা। পরে সাংবাদিকরা কিছুদূর গেলে পুনরায় কাজ শুরু করেন। অন্যদিকে তেঁতুলগাছ এলাকায় সাংবাদিকের উপস্থিতি দেখে ট্রাক ও স্কেভেটর নদী থেকে তুলে নিয়ে যান ড্রাইভার। কিছুক্ষণ পর সেখানে মোটরসাইকেল নিয়ে উপস্থিত হন মো. শাকিল নামে এক যুবক। এ সময় কথা হলে তিনি জানান, বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে তিনি বালু নিয়ে যান। দৈনিক কয়েকটি গাড়িতে যে বালু নেওয়া হয় সেখান থেকে পরিমাণ অনুযায়ী ভাড়া পান মাত্র।
সবশেষ পলিকাপাড়া এলাকায় ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক অংচওয়াং মার্মা, সুমন দত্ত, লিটন দাশ, রায়হান সিন্ডিকেট চালিয়ে যাচ্ছেন সাঙ্গু নদীর বালু বাণিজ্যে। স্থানীয়রা জানান, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ‘সবাই মিলেমিশে’ পরিবেশের ধ্বংসযজ্ঞ চালালেও তাদের প্রতিরোধ করার যেন কেউ নেই। খনন যন্ত্র দিয়ে বালু তোলার কারণে নদীর পাড় ও সড়ক ভাঙন দেখা দিয়েছে। গণমাধ্যমের চাপের মুখে কয়েক দিন বালু তোলা বন্ধ রাখা হলেও সিন্ডিকেট সদস্যরা পুনরায় শ্রমিক নিয়োগ করেছে। স্তুপ করা বালু ট্রাক যোগে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নদীর পাড়ে নতুন করে কাজ করছে শ্রমিকরা।
এদিকে বালু তোলার প্রসঙ্গ উঠলেই স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্কের ছাপ তৈরি হয়। প্রভাবশালী মহল কর্তৃক পরিবেশ ধ্বংসের এমন তৎপরতার জন্য প্রশাসনের নিরব ভূমিকাকে দায়ী করেন।
জানতে চাইলে রুমা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শৈবং মার্মা বলেন, নদী থেকে বালু তুলার কারণে পরিবেশের যেমন ক্ষতি হচ্ছে তেমনি নদীর পাড়ও ভাঙছে। পাশাপাশি বালু তুলার ফলে নদী শুকিয়ে যাবে। সদর ইউনিয়ন এলাকায় সাঙ্গু নদীতে বেশকিছু মেশিন বসিয়ে বালু তুলার কথা স্বীকার করেন তিনি।
জানতে চাইলে বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. ফখর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, যেহেতু বালুমহাল ঘোষণা নেই। আবার সেখানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। যার কারণে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। তাই বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ নেবেন।
সাঙ্গু নদীতে খননযন্ত্র ও বালু তোলা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, সাঙ্গু নদীতে এমন কর্মযজ্ঞের বিরুদ্ধে যদি আমরা ব্যবস্থা নিতে না পারি তাহলে বুড়িগঙ্গা, কর্ণফুলি বা তুরাগ নদীর মতো পরিণতি ভোগ করতে হবে এই নদীকেও। তাই সাঙ্গু নদীকে সংরক্ষণ এবং বাঁচিয়ে রাখার জন্য জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানান এই পরিবেশবাদী।
প্রসঙ্গত, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী, পাম্প, ড্রেজিং বা অন্য কোনো মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ বালু উত্তোলন করা যাবে না। সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, সড়ক, অথবা আবাসিক এলাকা থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ। আইন অমান্যকারীর দুই বছরের কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু রুমায় এমন বিধি নিষেধ কেউই মানছে না।
জেবি