দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যশোরে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানের নামে এক নিরীহ রিকশাচালককে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে র্যাবের বিরুদ্ধে। রোববার (২৪ ডিসেম্বর) বিকেল তিনটা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত যশোর শহরের রায়পাড়া সার গোডাউন এলাকায় ইউনুচ আলীর (৪০) বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী ইউনুচ আলী বলেন, ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী চারজন আমার বাসায় আসলেন। এসে জিজ্ঞাসা করলেন আপনার নাম কি ইউনুচ? বললাম হ্যাঁ। এই বলেই তারা ঘরে ঢুকে গেলেন। ঘরে ঢুকেই তারা বললেন আমরা র্যাবের লোক। এরপর ঘরের এদিকে-ওদিকে একটু তাকিয়েই তাদের মধ্যে থেকে একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করলো মালডা কই? বুঝতে না পারাতে আমি বললাম কী জিনিস স্যার? তখন তাদের মধ্যে একজন বললো-বুঝবি! যখন হাত-পা বেঁধে ঝুলাবো! কিছু না পেয়ে আমাকে হাতে হ্যান্ডক্যাপ লাগালেন তারা। চেয়ারে পড়ে থাকা আমার ১০ বছর বয়সী মেয়েটার হিজাবটা দিয়ে মুখ বেঁধে ফেললেন। এরপর তাদের কাছে থাকা লাঠি দিয়ে তারা এলোপাতাড়ি নির্যাতন করতে থাকেন।
রোববার (২৪ ডিসেম্বর) বিকেল তিনটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত তারা নির্যাতন চালায়। মুখ বাধার কারণে চিৎকারও করতে পারেনি। তারপরেও তারা নির্যাতন বন্ধ করেনি। সোমবার (২৫ ডিসেম্বর) দুপুরে যশোর প্রেসক্লাব এসে এভাবেই নিজের নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন রিকশাচালক ইউনুচ আলী (৩৫)। তিনি যশোর শহরের রায়পাড়া সার গোডাউন এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে স্ত্রী, দুই সন্তান ও বয়স্ক মাকে নিয়ে বসাবস করেন।
ভুক্তভোগী ইউনুচের অভিযোগ, র্যাব মিথ্যা অস্ত্র উদ্ধারের নামে তাকে নির্যাতন করেছে। আমার নামে কোনো মামলা নেই। তবে র্যাবের দাবি, ভুক্তভোগী রিকশাচালকের বাসাতে অস্ত্র রাখার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভিযান চালানো হয়েছিল। তবে তাকে কোনো নির্যাতন করা হয়নি। তার অভিযোগ মিথ্যা।
জানা গেছে, রিকশাচালক ইউনুচ আলীর গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার মুকছেদপুর গ্রামে। তার বাবার নাম মৃত শাহাদাত মোল্লা। প্রায় এক দশক পরিবার নিয়ে যশোর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রায়পাড়া সারগোডাউন এলাকাতে বসাবস করেন। নিয়মিত রিকশা চালানোর পাশাপাশি সার গোডাউনেও কাজ করেন তিনি। র্যাবের কাছে নির্যাতনে আহত হয়ে বর্তমানে তিনি যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
র্যাব সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাব জানতে পারে রিকশাচালক ইউনুচের বাড়িতে এক সন্ত্রাসীর অস্ত্র রাখা রয়েছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার বিকেল তিনটার দিকে ইউনুচের বাড়িতে অভিযান চালায়। তবে অভিযানের রিকশাচালকের বাড়িতে অস্ত্রের সন্ধান পায়নি র্যাব।
মাকে নিয়ে প্রেসক্লাবে এসে তিনি যখন জামাকাপড় খুলে নির্যাতনের ক্ষত দেখাচ্ছিলেন সাংবাদিকদের তখন তিনি অঝরে কাঁদছিলেন। রিকশাচালক ইউনুচের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ক্ষতের চিহ্ন দেখা গেছে। পায়ে আঘাত করার কারণে দুই পা দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখা যায়।
ইউনুচ বলেন, আমি রিকশা চালিয়ে সংসার চালাই। প্রতিদিনের মতো শহরে রিকশা চালিয়ে দুপুরে ভাত খেতে যাই। ভাত খাওয়ার পর পর র্যাবের লোকজন আসে। এসে অস্ত্রের কথা জিজ্ঞাসা করে। তারা অভিযান চালিয়ে কোনো অস্ত্র পায়নি। তিনি বলেন, আমি কখনো অস্ত্রই দেখেনি। তার পরেও আমাকে এভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। র্যাবের সদস্যরা যখন আমাকে জিজ্ঞাবাদ করে তখন আমি কুরআন শরীফ ও আমার মায়ের মাথার উপরে হাত রেখে বলেছি আমার কাছে অস্ত্র নেই। তারপরেও তারা বিশ্বাস করেনি। হাতে হ্যান্ডক্যাপ পরিয়ে, মুখে আমার মেয়ের হিজাব দিয়ে বেঁধে নির্যাতন করেছে। আমি এখন অসুস্থ ও আতঙ্কিত।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইউনুচের মা রাবেয়া বেগম বলেন, আমরা অনেক গরিব মানুষ। আমার ছেলে রিকশা চালিয়ে সংসার চালায়। কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না। কখনো কোনো মামলাও নাই। তারপরেও মিথ্যা অভিযোগে আমার ছেলেটারে র্যাব এসে নির্যাতন করেছে। আমরা তাদের কতবার বুঝিয়েছি তার পরেও তারা কোনো কথা শুনেনি। ছেলেটা এখন অনেক অসুস্থ।
বিকালে সার গোডাউন পাড়াতে গিয়ে কয়েকজন প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউনুচরা দীর্ঘদিন ধরে এই সারগোউন এলাকাতে বসাবস করে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। র্যাব যখন তাদের বাড়িতে প্রবেশ করে উৎসুক এলাকাবাসীকে তখন ইউনুচের বাড়ি থেকে বের করে দেয়। পরে ঘরের ভেতরে কি হয়েছে সেটা জানি না।
এ বিষয়ে র্যাব-৬ যশোরের কোম্পানি অধিনায়ক মোহাম্মদ সাকিব হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিকে ইউনুচের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। আমাদের কাছে তথ্য ছিল ইউনুচের বাড়িতে অস্ত্র রাখা আছে। জিজ্ঞাসাবাদে অস্ত্র রাখার কথা ইউনুচ ও তার মা স্বীকার করেছে র্যাবের কাছে। তবে অভিযানের আগেই অস্ত্রটি যে রেখেছিল তিনি নিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, অভিযানে তাকে কোনো নির্যাতন করা হয়নি। তার অভিযোগ মিথ্যা।
মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, কেউ অপরাধ করলে সাংবিধানিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। কিন্তু নির্যাতন করা মানবাধিকার লঙ্ঘন। রিকশাচালক ইউনুচের ওপর নির্যাতনের ভয়াবহতা দেখেছি। অমানবিক নির্যাতন চিহ্ন তার শরীরে ফুটে উঠেছে। তার আইনগত ব্যবস্থার দরকার হলে আমরা তাকে সহযোগিতা করব।
জেবি