দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

গাজীপুরে রেললাইনে নাশকতার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ২৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসান আজমল ভূঁইয়াসহ ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে গাজীপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ ব্যাপারে রোববার (১৭ ডিসেম্বর) দুপুরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ঘটনার বিস্তারিত বলেন মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. মাহবুব আলম।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, জান্নাতুল ইসলাম, মেহেদী হাসান, কাউন্সিলর হাসান আজমল ভূঁইয়া, জুলকারনাইন আশরাফী ওরফে হৃদয়, শাহানুর আলম, সাইদুল ইসলাম ও সোহেল রানা। তারা সবাই বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, গাজীপুরের ভাওয়াল গাজীপুর ও রাজেন্দ্রপুর রেলওয়ে স্টেশনের মধ্যবর্তী বনখড়িয়া এলাকায় রেললাইন কেটে ফেলায় গত বুধবার (১৩ ডিসেম্বর) ভোর ৪টার দিকে নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ থেকে ঢাকার কমলাপুরগামী মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনসহ ৭টি বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে ট্রেনযাত্রী আসলাম মিয়া নিহত ও লোকো মাস্টারসহ ১০ জন গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় মামলার পর পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তদন্তে নামে।
তদন্তের এক পর্যায়ে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুস্কৃতিকারী জান্নাতুল ইসলাম ও মেহেদী হাসানকে আটক করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ঘটনায় জড়িতদের বিস্তারিত তথ্য জানতে পারে পুলিশ।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা জানায়, গত ১২ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পরে কোনাবাড়ি থেকে একটি হায়েস গাড়ি ঢাকা যাওয়ার কথা বলে ভাড়া করা হয়। কিন্তু ঢাকায় না গিয়ে ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে তারা রেল লাইন কেটে নাশকতা ঘটানোর উদ্দেশ্যে বের হয়। পথিমধ্যে তারা শিববাড়ী, জোড় পুকুরপাড় সহ আরো বিভিন্ন স্থান থেকে বেশ কয়েকজনকে গাড়ীতে উঠায়। তারা গাজীপুর সদর থানার জোড় পুকুরপাড়ের ইবনে সিনহা তোহার বাড়ি থেকে রেল লাইন কাটার যন্ত্রপাতি এবং দক্ষিণ সালনার উসমান গণির ভাড়া দেওয়া বাশ বাগান রেস্টুেরেন্ট থেকে দুইটি গ্যাস সিলিন্ডার গাড়িতে উঠায়। পরে সরঞ্জামসহ তারা শিববাড়ী মোড় থেকে আরও দুইজন ব্যক্তিকে উক্ত গাড়িতে উঠায়। সময়ক্ষেপন করার জন্য তারা রেস্টুরেন্টে খাওয়া দাওয়া ও শহরের ভিতরে বিভিন্ন অলি গলিতে ঘোরাঘুরি করে। আনুমানিক রাত দেড়টার দিকে বনখরিয়া এলাকায় ঘটনাস্থল থেকে ৪-৫ কিলোমিটার দূরত্বে বনের পাশে গাড়ী রেখে নাশকতাকারীরা পায়ে হেঁটে গ্যাস সিলিন্ডারসহ সরঞ্জমাদী নিয়ে বনখরিয়া চিনাই রেল ব্রীজের পাশে যায়। সেখানে সুযোগবুঝে ভোর ৩টা থেকে ৪ টার মধ্যে তারা ২০ ফিট রেল লাইন কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
এর কিছু সময় পর ওই রেল সড়কে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ভোর ৪টা ১০মিনিটের দিকে দুর্ঘটনার শিকার হয়।
এ ঘটনায় মহানগর ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুম ও ছাত্রদলের ত্বোহাসহ আট জন অংশ গ্রহণ করেন।
এ ঘটনার ঘটিয়েই তারা গাড়ী নিয়ে ঢাকায় চলে যায়। ঢাকায় গিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশে চার জন গাড়ী থেকে নেমে যায় এবং বাকী সদস্যরা পরবর্তীতে মিরপুরে গিয়ে নামে। মিরপুরে নেমে তারা নিজেদের কাছে টাকা না থাকায় ফোনে অন্য একজনকে ড্রাইভারের নাম্বারে টাকা পাঠাতে বলে। সেই মোতাবেক ড্রাইভার সাইফুলের বিকাশে ৮হাজার ১০০ টাকা পাঠিয়ে দেয়।
পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ২৮ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাসান আজমল ভূইয়া সহ জুলকার নাইন আশরাফি ওরফে হৃদয়, শাহানুর আলম, মো. সাইদুল ইসলাম, সোহেল রানাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে গেল ১১ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে ২৮ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সাবেক বিএনপি নেতা আজমল ভূঁইয়ার বাসাসহ বিভিন্ন স্থানে তাদের গোপন সভা হয়। সেখানে রেল লাইন কেটে নাশকতা ঘটানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত এবং পরিকল্পনা করা হয়।
সভায় এ আলোচনা হয় যে, দলীয় উচ্চ পর্যায় থেকে বড় কিছু করার চাপ আছে, বড় কোনো ঘটনা ঘটলে দেশ ও বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি হবে তাই তারা রেল লাইনে নাশকতা ঘটানোর পরিকল্পনা করে। সরকারের বর্তমান নির্বাচনি কার্যক্রমকে বিতর্কিত করা, আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বর্তমানে বিরাজমান রাষ্ট্রীয় সু-শৃঙ্খল পরিবেশকে নষ্ট করা, জনমনে ভীতি সঞ্চার করা এবং এর মাধ্যমে দেশ ও বিদেশে ব্যাপক মিডিয়া কাভারেজ, হরতাল-অবরোধ সফল করার জন্য ব্যাপক প্রাণহানির ও ধ্বংসযজ্ঞের জন্য রেললাইনকে বেছে নেওয়া হয়েছিল যা দেশ ও বিদেশে আলোড়ন তৈরি করতে পারে। তার প্রেক্ষিতে গত ১৩ ডিসেম্বর ঢাকা-ময়মনসিংহ রেল সড়কে নাশকতার ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এই ঘটনার কাজে ব্যবহৃত মাইক্রোবাস উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
গাড়ির চালক সাইফুল বলেন, তার ভাড়াকরা গাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে শিমুলতলী এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকন রাস্তায় জঙ্গলের পাশে গাড়ি রেখে ৮ জন বের হয়ে যান। ঘণ্টা খানেক পর তারা ফিরে এসে গাড়িত ওঠেন। পরে তাদের কয়েকজন ঢাকা মেডিকেল কলেজের পাশে এবং মিরপুর এলাকায় চারজন নেমে যান।
পুলিশ ব্রিফিংয়ে গাজীপুর জেলা প্রশাসক আবুল ফাতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম, গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার কাজী শফিকুল আলম, গাজীপুর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাকছুদের রহমান, রেলওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেনসহ জেলা ও মহানগর পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে রেলে নাশকতা ও হত্যার ঘটনায় কমলাপুর রেলওয়ে থানায় বৃহস্পতিবার মামলা হয়। রেলওয়ে কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বাদি হয়ে কমলাপুর থানায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে এ মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনা তদন্তে রেলওয়ে, গাজীপুর জেলা প্রশাসন এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আলাদা তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এম