দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

জলের ওপর কচুরিপানা জমিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি করা হয় ভাসমান বেড বা ধাপ। এসব ধাপে ফলানো হচ্ছে দেশি-বিদেশি নানা জাতের সবজি ও চারা। আর এই চাষাবাদ ঘিরেই বদলে যাচ্ছে পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদের হাজারো কৃষকের জীবন। শত শত একর জলাভূমিজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। ঐতিহ্যবাহী এই ভাসমান কৃষিকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। এতে পুরুষের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন গ্রামের নারীরাও।
দেশের অন্যতম বৃহৎ ভাসমান কৃষি ও সবজির চারা উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলায়। পিরোজপুর শহর থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরে উপজেলার দেউলবাড়ী দোবরা ইউনিয়নের বৈঠাকাটা বাজারসংলগ্ন মুগারঝোর গ্রাম এর অন্যতম কেন্দ্র। এ ছাড়া কলারদোয়ানিয়া, মালীখালী এবং পার্শ্ববর্তী নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামেও বিস্তৃত হয়েছে এই কৃষি।
এসব এলাকায় বর্ষা মৌসুমে প্রায় ছয় মাস পানি জমে থাকে। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে জমিতে সবজির চারা উৎপাদন ও চাষাবাদ কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে পানিকে বাধা নয়, বরং চাষাবাদের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
বর্ষার শুরুতে খাল-বিলে জমে থাকা কচুরিপানা একত্র করে পচানো হয়। পরে কয়েক স্তরে জমাট বেঁধে তৈরি করা হয় ২ থেকে ৩ ফুট পুরু এবং ৫০ থেকে ১০০ ফুট লম্বা ভাসমান বেড বা ধাপ। এসব বেডে শসা, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, বরবটি, করলা, টমেটো, চালকুমড়া ও বেগুনের বীজ বপন করে চারা উৎপাদন করা হয়। পাশাপাশি সরাসরি লালশাক, পালংশাক, ডাঁটাশাক ও পুঁইশাকও চাষ করা হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মৌসুমে ভাসমান বেডে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় এক কোটি সবজির চারা উৎপাদিত হয়। এসব চারা বিক্রি করে আয় হয় প্রায় ১০ কোটি টাকা। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মৌসুমে এখান থেকে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় বিপুল পরিমাণ সবজির চারা ও তাজা সবজি সরবরাহ করা হয়। দক্ষিণাঞ্চলের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চল থেকেও কৃষকেরা এখানে চারা কিনতে আসেন। বর্তমানে এ পেশার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন প্রায় ছয় হাজার কৃষক।
এই ভাসমান কৃষির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছেন গ্রামের নারীরা। পুরুষেরা যখন জলাশয়ে ধাপ তৈরি ও যাতায়াতের কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন নারীরা লতা সংগ্রহ, ম্যাদা তৈরি, বীজ বপন ও চারার পরিচর্যা করেন। বাড়ির আশপাশে কিংবা জলাভূমির কাছে বসেই চলে তাঁদের এসব কাজ। তবে কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অনেক নারী শ্রমিকের আয় বেশ সীমিত।
কচুরিপানা, দুলালীলতা, শ্যাওলা, টেপপানা ও গুঁড়িপানাসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদের সঙ্গে খড়কুটা দিয়ে ছোট ছোট গোলাকার বিড়া বা দোলনা তৈরি করেন নারীরা। এর ভেতরে মাটি ও পচাপাতা দিয়ে বীজের অঙ্কুরোদগম ঘটানো হয়। বীজ থেকে চারা গজানোর পর সেগুলো বড় করা, পোকামাকড় দমন এবং ধাপে বসানোর উপযোগী করে তোলার কাজও করেন পরিবারের নারী ও কিশোরীরা।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, পিরোজপুরে ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো। দীর্ঘদিনের এই কৃষিপদ্ধতি পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে পানির ওপর ফসল ফলানোর এই পদ্ধতিকে ২০১৫ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) গ্লোবালি ইম্পর্ট্যান্ট অ্যাগ্রিকালচারাল হেরিটেজ সিস্টেম (জিআইএএইচএস) বা বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী কৃষি পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
ভাসমান কৃষির প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে নাজিরপুরের বৈঠাকাটা হাট। ভোরের আলো ফুটতেই নদীতে সারি সারি নৌকায় শুরু হয় বেচাকেনা। আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে বিক্রেতারা নৌকায় করে জলজ উদ্ভিদ নিয়ে আসেন। কৃষকেরা এক নৌকা থেকে অন্য নৌকায় ঘুরে প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনেন। শনিবার ও মঙ্গলবার বসা এই হাট থেকেই শুরু হয় ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম।
হাটে শ্যাওলা বিক্রি করতে আসা বাগেরহাটের চিতলমারীর আরমান খান (৪৫) বলেন, কুড়ি হিসেবে শ্যাওলা ১৬০ থেকে ৩২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন তিনি। বেচাকেনা মোটামুটি হলেও ভালো দিনে আট থেকে নয় হাজার টাকার শ্যাওলা বিক্রি হয়। বাজার খারাপ থাকলে বিক্রি কমে যায়।
শ্যাওলা কিনতে আসা আব্দুল কাইউম মোল্লা (৩৩) বলেন, ভাসমান বেড তৈরি করে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও চারা উৎপাদনের জন্য শ্যাওলা কিনতে এসেছেন তিনি।
দেউলবাড়ী দোবরা ইউনিয়নের মুগারঝোর গ্রামের চাষি আসলাম ফকির (৫৫) বলেন, গত সাত-আট বছর ধরে ভাসমান বেড তৈরি ও সবজির চারা উৎপাদন করছেন তিনি। নিজের কাজের পাশাপাশি গ্রামের অসচ্ছল ও কর্মহীন মানুষদেরও এ কাজে যুক্ত করেছেন।
আসলাম ফকির আরও বলেন, এলাকার অনেক অসহায় পরিবারকে ভাসমান পদ্ধতিতে চারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করতে চান তিনি। এ জন্য বিনা সুদে ঋণ প্রয়োজন। সরকার এমন ঋণের ব্যবস্থা করলে এলাকার বেকার তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
পার্শ্ববর্তী বলদিয়া গ্রামের নারী শ্রমিক মিনারা বেগম (৩৬) বলেন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করেও দৈনিক মাত্র ২০০ টাকা পান তিনি। এক হাজার ম্যাদা তৈরি করে মজুরি হিসেবে পান ১৫০ টাকা। এই আয়ে সংসার চালানো কঠিন। নারীদের অন্য কাজের সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে তাঁরা এই কাজ করছেন। তাঁদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে ভালো হতো বলেও জানান তিনি।
পিরোজপুরের কাউখালী বাজারের সবজির চারা বিক্রেতা মান্নান বেপারী (৫২) বলেন, নাজিরপুরের ভাসমান বেড থেকে প্রতি পিস চারা পাঁচ থেকে সাত টাকা দরে কিনে কাউখালী বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন। বাজারের দিন বিভিন্ন জাতের এসব চারা ১০ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি করেন তিনি।
জাত, আকার, চাহিদা ও বাজারভেদে চারার দাম কমবেশি হয়। পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের এই ব্যবধান থেকে পরিবহন খরচ মিটিয়ে ব্যবসায়ীরা আয় করেন। ফলে চারা উৎপাদনকারী কৃষক, পাইকার, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও খুচরা বিক্রেতাদের ঘিরে গড়ে উঠেছে বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
তবে ভাসমান কৃষিকে আরও লাভজনক করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। তাঁদের মতে, চারা ও পচনশীল সবজি দূর-দূরান্তে সরবরাহের জন্য উন্নত পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি মৌসুমি মূলধনের সংকট কাটাতে সহজ শর্তে স্বল্প সুদে বা সুদমুক্ত ঋণ এবং আধুনিক বীজ সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক কীটনাশক ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, নাজিরপুর ও নেছারাবাদে ভাসমান বেডে উৎপাদিত সবজির চারা খুলনা, যশোর, ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। এ পেশার সঙ্গে জড়িত কৃষকদের কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
যে আই