দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নয়াগোলা মোড় এলাকায় থাকেন মশিউর রহমান। জনবহুল এই এলাকায় প্রতিদিন ফেলা হচ্ছে নানা ধরনের বর্জ্য। এতে এলাকাবাসী ও ওই সড়ক দিয়ে চলাচলকারীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। মশিউর রহমান বলেন, ট্রাকে করে ময়লা এনে নয়াগোলা ডাম্পিং স্টেশনে ফেলা হয়। বাতাস এলে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে এলাকায় বসবাস করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
পুলিশ লাইন এলাকায় থাকেন জাহাঙ্গীর আলম। চাকরি করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের একটি প্রতিষ্ঠানে। ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিনই তাকে পুলিশ লাইন এলাকা থেকে নয়াগোলার ময়লার ভাগাড়ের পাশ দিয়ে শহরে যাতায়াত করতে হয়। তিনি বলেন, ময়লার দুর্গন্ধে ঘরে থাকা যায় না। বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এতে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার বাসাবাড়ির অধিকাংশ ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয় নয়াগোলা মোড়ের সড়কের পাশে। পুলিশ লাইনের ঠিক বিপরীতে জনবহুল এলাকায় অবস্থিত এই ডাম্পিং স্টেশন। শহরের দ্বারিয়াপুরেও রয়েছে আরেকটি ল্যান্ডফিল্ড। সব মিলিয়ে নয়াগোলা ও দ্বারিয়াপুরের দুটি স্থানই এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ফলে আশপাশের বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শতবর্ষী এই পৌরসভায় গড়ে ওঠেনি পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ভুল পরিকল্পনার কারণে ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একমাত্র স্যানিটারি ল্যান্ডফিল্ডও কাজে আসছে না। ফলে এখনো সনাতন পদ্ধতিতেই চলছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। শহরের দুটি ল্যান্ডফিল্ডের ধারণক্ষমতাও প্রায় শেষ। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি তৈরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অতীতে পৌরসভার পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সমাধান আসেনি। এ পরিস্থিতিতে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করেছে পৌরসভা। বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে আজ ৫ নভেম্বর বিদ্যমান স্যানিটারি ল্যান্ডফিল্ড আধুনিকায়নে নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (আইইউজিআইপি) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রতিনিধিরা চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা পরিদর্শন করবেন।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভায় প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে পৃথক্করণ ছাড়াই প্রাথমিকভাবে প্রায় ৫০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। এসব বর্জ্য ময়লা রাখার ঘর (সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন) অথবা এলাকাভিত্তিক কনটেইনারে রাখা হয়। পরে সেখান থেকে ল্যান্ডফিল্ডে নিয়ে ফেলা হয়। সনাতন এই ব্যবস্থায় পরিবেশগত বিষয়গুলো উপেক্ষিত থাকছে।
সরেজমিনে নয়াগোলা ডাম্পিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, পৌরসভার অধিকাংশ ময়লা-আবর্জনা খোলা জায়গায় ফেলতে ফেলতে সেখানে বিশাল স্তূপ তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৫০ টন বর্জ্য ফেলা হয় এই স্থানে। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ময়লার স্তূপের উচ্চতা ও বিস্তৃতি। পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধ। পৌরসভার জায়গায় গড়ে ওঠা ময়লার এই স্তূপ থেকে আশপাশের জনবহুল এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। নাক চেপে না ধরলে সড়ক দিয়ে চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়ে। সড়কের পাশে বর্জ্যের স্তূপ শহরের অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরছে।
নয়াগোলা ও দ্বারিয়াপুরের দুটি ল্যান্ডফিল্ডের ধারণক্ষমতা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। দ্বারিয়াপুর স্যানিটারি ল্যান্ডফিল্ড হিসেবে পরিচিত হলেও সেখানে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। দূর থেকে ময়লার স্তূপগুলোকে পাহাড়ের মতো দেখায়। নয়াগোলা ডাম্পিং স্টেশনে প্রায় ১০ ফুট উঁচু বর্জ্যের স্তূপ দেখা গেছে। নয়াগোলার ৩ দশমিক ৪৬ একর জমিতে অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। অন্যদিকে, দ্বারিয়াপুরে চার একর জমিতে ২০২০ সালে ল্যান্ডফিল্ডটির কার্যক্রম শুরু হয়। এতে আধুনিক অবকাঠামো থাকলেও বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা নেই। ফলে দুটি ল্যান্ডফিল্ডই বর্জ্যের চাপে সক্ষমতা হারাচ্ছে। কয়েক শ মিটার দূর থেকেও এসব স্থান থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধ পাওয়া যায়।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) মো. মাহবুব হাসান বলেন, উন্মুক্ত স্থানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বর্জ্যে থাকা ধুলিকণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে সেগুলো গ্রহণ করে। তাই ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও সচেতন হতে হবে।
নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব মো. মনিরুজ্জামান মনির বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিন বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জরুরি হয়ে পড়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার শহর-পরিকল্পনাবিদ ইমরান হোসাইন বলেন, বর্জ্যের ধরন অনুযায়ী ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান স্যানিটারি ল্যান্ডফিল্ড আধুনিকায়নে আইইউজিআইপি ও এডিবির অর্থায়নে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে ৫ নভেম্বর প্রকল্প কর্মকর্তা ও এডিবির প্রতিনিধিরা পৌরসভা পরিদর্শন করবেন। নতুন পরিকল্পনায় বর্জ্যের ধরন অনুযায়ী ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার উৎপাদন ও রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট স্থাপনের সুবিধা রাখা হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন অর রশীদ বলেন, পৌরসভায় প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। নিয়মিত প্রায় ৫০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করা হলেও স্থায়ী ও আধুনিক ল্যান্ডফিল্ড সুবিধা না থাকায় সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা যাচ্ছে না। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যে আই