দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পরিকল্পিত নগরায়ণের লক্ষ্যে ৩০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। চলতি বছর মহানন্দা নদীতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাবার ড্যাম নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। ৩৯৩ মিটার দীর্ঘ এই রাবার ড্যাম নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২৭০ কোটি টাকা। এসব প্রকল্পের প্রয়োজনে ২১২ কোটি ৬১ লাখ টাকার ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা দুটি প্রকল্পের ৮৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা আটকে রেখেছে। বছরের পর বছর অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পেতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ঘুরছেন জমির মালিকেরা। অথচ বিধান অনুযায়ী, প্রত্যাশী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা জমা হওয়ার ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা। প্রশাসন জমির দখল বুঝে নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে হস্তান্তর করার পরই নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে জমির মালিকদের।
জমি অধিগ্রহণে ধীরগতিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয়—দুটিই বেড়েছে।
দেশ টিভির অনুসন্ধানে অধিগ্রহণের টাকা আটকে রাখার অভিযোগ এবং জমির মালিকদের হয়রানির নানা তথ্য উঠে এসেছে। এসব অনিয়ম ও হয়রানির পেছনে জেলা প্রশাসনের অধিগ্রহণ শাখার কর্মকর্তাদের ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জেলা প্রশাসনের অধিগ্রহণ শাখায় জমির মালিকদের হয়রানিতে একটি নির্দিষ্ট কৌশল অনুসরণ করা হয়। প্রায় এক দশক ধরে জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে এমন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তা বদলালেও হয়রানির ধরন বদলায় না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। তাঁদের দাবি, সর্বশেষ দলিলগ্রহীতা, নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা প্রদানকারী ব্যক্তিই জমির প্রকৃত মালিক। তাঁকে নোটিশ করলেই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হয়। কিন্তু অধিগ্রহণ শাখা থেকে বিভিন্ন রেকর্ডীয় মালিকের কাছে নোটিশ পাঠিয়ে বিষয়টি জটিল করা হয়।
নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৮ সালের আগস্টে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে মহানন্দা নদীর সেতুর সঙ্গে সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে ২১ দশমিক ৪৫ একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করে জেলা প্রশাসন। তিনটি প্যাকেজে জমি অধিগ্রহণের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১৪১ কোটি ৯১ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। বিধি অনুযায়ী কয়েক দফায় ভূমি অধিগ্রহণের টাকা জেলা প্রশাসনকে পরিশোধ করে প্রত্যাশী প্রতিষ্ঠান পৌরসভা।
মহানন্দা দ্বিতীয় সেতু থেকে বিনপাড়া হয়ে কোপরা পর্যন্ত সংযোগ সড়কের জন্য ৫ দশমিক ৮৪ একর জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রশাসন ১০৪ বছর আগের সিএস রেকর্ডে জমিগুলো নদী হিসেবে চিহ্নিত থাকার বিষয়টি সামনে আনে। এতে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া গড়িয়েছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও উচ্চ আদালত পর্যন্ত। জমির মালিকদের পাওনা ১৪ কোটি টাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পড়ে রয়েছে। অন্যদিকে, জমি অধিগ্রহণ না হওয়ায় কাজ শুরু করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বাকি দুই প্যাকেজেরও অধিকাংশ টাকা বিতরণ করা হয়নি।
একই কৌশলে মহানন্দা নদীতে রাবার ড্যাম প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের ৭০ কোটি ৭০ লাখ টাকা আটকে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও অধিগ্রহণ করা জমির মালিকেরা এখনো ক্ষতিপূরণ পাননি। অথচ অধিগ্রহণের পুরো টাকা জেলা প্রশাসনকে বুঝিয়ে দিয়েছে প্রত্যাশী সংস্থা পানি উন্নয়ন বোর্ড।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সদ্য বিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম আহসান হাবিব বলেন, অধিগ্রহণের টাকা জেলা প্রশাসনকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। জমির মালিকদের টাকা দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়ে জেলা প্রশাসকই সঠিক তথ্য দিতে পারবেন।
দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ার বিষয়ে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী তৌফিকুল ইসলাম বলেন, জমি অধিগ্রহণে বিলম্বের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নেও দেরি হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখার সামনে কথা হয় ব্যবসায়ী তরিকুল ইসলামের সঙ্গে। পৌরসভার চরনয়নশুকা মৌজায় তাঁর ২৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ জমি ২০২০ সালে অধিগ্রহণ করা হয়। এ-সংক্রান্ত এলএ কেস নম্বর ০১/২০১৯-২০। ছয় বছরের বেশি সময় পার হলেও তিনি ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি।
তরিকুলের অভিযোগ, ৭ ধারার নোটিশে জমির শ্রেণি ধানী উল্লেখ করা হলেও ৮ ধারার নোটিশে তা পরিবর্তন করে ডোবা করা হয়। তাঁর দাবি, চাহিদামতো ১০ লাখ টাকা ঘুষ না দেওয়ায় তৎকালীন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা জমির শ্রেণি পরিবর্তন করেন। তরিকুল বলেন, ধানী জমি হিসেবে তিনি ৮৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা পাওয়ার কথা। ডোবা শ্রেণিতেও সরকারি দর অনুযায়ী একই পরিমাণ টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও মনগড়া দর নির্ধারণ করে তাঁকে ১৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। এ বিষয়ে তিনি তখন লিখিত অভিযোগ দিলেও এতদিনে তা নিষ্পত্তি হয়নি। ক্ষতিপূরণের টাকাও পাননি। তাঁর মতো আরও অনেক ভুক্তভোগী অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পাননি বলে জানান তিনি।
আইনের লঙ্ঘন
২০১৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ‘স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল বিল-২০১৭’ পাস হয়। এতে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ তিন গুণ করার বিধান রাখা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, অধিগ্রহণের টাকা পরিশোধ না করায় এ আইনের ১১(১) উপধারা লঙ্ঘিত হয়েছে। এ ছাড়া সর্বশেষ আরএস জরিপ উপেক্ষা করা এবং ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করাও আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে দাবি করা হয়েছে।
দীর্ঘদিনেও অধিগ্রহণ করা জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম শতভাগ নির্ভুল ও আইনি জটিলতামুক্ত করতে প্রস্তাবিত জমির আগের ও বর্তমান রেকর্ড পর্যালোচনা করতে হয়। সিএস রেকর্ডে জমিটি নদী হিসেবে চিহ্নিত ছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ডভুক্ত হয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের অনাপত্তি প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, জমির ইতিহাস খতিয়ে দেখতে ভূমি জরিপ অধিদপ্তরের কারিগরি বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং ডিজিটাল ম্যাপিংয়ের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। যাতে ক্ষতিপূরণের অর্থ কোনো অবৈধ দখলদার বা ভুল রেকর্ডধারীর হাতে না যায়। উচ্চ আদালত দেশের সব নদ-নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সিএস রেকর্ডে কোনো জমি নদী হিসেবে থাকলে পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ডভুক্ত হলেও হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী নদী কোনো ব্যক্তির নিজস্ব সম্পত্তি হতে পারে না। তবে সংশ্লিষ্ট নদীটি অধিগ্রহণের জন্য প্রস্তাবিত জমি থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে।
রাবার ড্যাম প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, জমি অধিগ্রহণ শেষ হতে এত সময় লাগা গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে আইনি কাঠামোতে পরিবর্তন এসেছে, তবে এর ব্যবহারিক প্রয়োগে দুর্বলতা রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লে ব্যয়ও বাড়ে। অথচ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
তিনি আরও বলেন, জমি অধিগ্রহণ একটি জটিল ও স্পর্শকাতর প্রক্রিয়া। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব আইন ও পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়, যা অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ।
এমএস/