দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে (৩৮) দলবদ্ধ পিটুনিতে হত্যার মামলায় এজাহারনামীয় দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ভোরে উপজেলার সুবর্ণাবাদ ও নাজিরের ঘের এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের মৃত মাহতাব উদ্দিন খানের ছেলে মোক্তার হোসেন খান (৫৩) এবং নাজিরের ঘের গ্রামের রহিম বক্স মোল্লার ছেলে আসাদুল ইসলাম মোল্যা (৪৬)।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন জানান, তাঁর নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল শুক্রবার ভোরে সুবর্ণাবাদ এলাকা থেকে মোক্তার হোসেন খানকে গ্রেপ্তার করে। পরে একই দিন ভোর ৫টা ১০ মিনিটে আসাদুল ইসলাম মোল্যাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ অক্টোবর দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তাঁর ভাই আব্দুল জলিল সানা দেবহাটা থানায় মামলা করেন। মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
নিহতের ভাই আব্দুল জলিল সানার অভিযোগ, ধর্ম অবমাননার অপবাদ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে তাঁর ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের সাতক্ষীরা জেলা পর্ষদের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মুনির উদ্দিন অভিযোগ করেন, ফেসবুক লাইভ ও পোস্টের মাধ্যমে উসকানি ছড়িয়ে শামীমকে হত্যার পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। তাঁর দাবি, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাতক্ষীরা জেলা শাখার প্রধান সংগঠক মাধব দত্ত বলেন, একজন মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিকে হাসপাতাল থেকে বের করে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা আইন ও মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। এ ঘটনায় যাঁদের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
নিহতের পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্ত্রীর সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডার সময় শামীমের কথাবার্তার একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর বক্তব্য রয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে ফজলুল হক আমিনী ফেসবুক লাইভে জনতাকে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান বলে অভিযোগ পরিবারের। পরে উত্তেজিত জনতা শামীমের বাড়ির গেটে ভাঙচুর চালিয়ে তাঁকে সুবর্ণাবাদ বাজারে নিয়ে মারধর করে বলে তাঁদের দাবি।
পরিবারের অভিযোগ, একপর্যায়ে শামীমকে চিকিৎসার জন্য সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলেও পরে একদল লোক সেখানে গিয়ে তাঁকে মারধর করে। গুরুতর আহত অবস্থায় পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে পরিবার।
নিহতের ছোট ভাই তাহসিভ রহমান সাগর জানান, বুধবার রাতে এশার নামাজের পর জানাজা শেষে শামীমকে দাফন করা হয়েছে। তাঁর দুটি ছেলে রয়েছে—বড়টির বয়স ১২ বছর, আর ছোটটির বয়স সাত থেকে আট মাস। পরিবারের সদস্যরা হামলাকারীদের ভয়ে আতঙ্কে রয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
মানবাধিকারকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানির মাধ্যমে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এমএস/