দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে নানা আয়োজন হলেও কক্সবাজারের পর্যটন খাতের নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, নদী, ঝরনা ও নানা দর্শনীয় স্থান থাকলেও সন্ধ্যার পর পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। নেই নাইট বাজার, থিয়েটার হল, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, স্ট্রিট ফুডের ব্যবস্থা ও সৈকতের পাশে প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র। ফলে বিপুল বিনিয়োগের পরও পর্যটন সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’ প্রতিপাদ্যে কক্সবাজারেও বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত হচ্ছে। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দিবসটি উপলক্ষে সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে র্যালি বের হয়ে প্রধান সড়ক ঘুরে লাবণী উন্মুক্ত মঞ্চে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। পর্যটকদের এসব আয়োজনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সমন্বয়ক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীরা জানান, বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ ১২০ কিলোমিটার অখণ্ড সৈকতকে ঘিরে আশির দশক থেকে কক্সবাজারে পর্যটনের বিকাশ শুরু হয়। শুরুতে হাতে গোনা কয়েকটি আবাসিক প্রতিষ্ঠান থাকলেও নব্বইয়ের দশক থেকে পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। কলাতলীকে হোটেল-মোটেল জোন ঘোষণার পর সেখানে প্রায় ৫০০ আবাসিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হলেও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণে পর্যটন অবকাঠামোর বড় অংশ এখনো অপরিকল্পিত বলে তাদের অভিযোগ।

পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণও নেই। নেই পরিকল্পিত স্ট্রিট ফুডের ব্যবস্থা। সাগরতীরে হাঁটা ও গোসলের বাইরে রাতে পর্যটকদের জন্য বিনোদনের সুযোগও সীমিত। নেই থিয়েটার হল, নাইট বাজার বা পরিকল্পিত নাইট লাইফ। রাতের সৈকতে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জার ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল, সৈকতের পাশে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা ও ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টারের মতো প্রয়োজনীয় সেবাও নেই।
তাদের দাবি, এসব সীমাবদ্ধতা ও হয়রানির কারণে কক্সবাজারের পর্যটন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ কমেছে। দেশীয় পর্যটকরাও একবার কক্সবাজার ঘুরে যাওয়ার পর দ্বিতীয়বার আসতে আগ্রহী হন না বলে পর্যটনসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি। তবে সমুদ্র ও পাহাড়ের আকর্ষণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক দেশীয় পর্যটক কক্সবাজারে আসেন।
জেলা প্রশাসন, পর্যটন করপোরেশন ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে পাহাড়, সমুদ্র, নদী, ঝরনা, পাথুরে সৈকত, পাথুরে পাহাড়, আদিনাথ মন্দির, সোনাদিয়া দ্বীপ, রামুর বৌদ্ধ বিহার, রাবার বাগান, চা বাগান, গর্জন বিহার, টেকনাফের মাথিনের কূপ ও সেন্টমার্টিন, কুতুবদিয়ার বাতিঘরসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এসব স্থান দেখতে প্রতিবছর লাখো দেশীয় দর্শনার্থী এলেও পর্যাপ্ত বিনোদন ব্যবস্থা না থাকায় বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টদের মত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক হোটেল মালিক অভিযোগ করেন, সমুদ্র ছাড়া কক্সবাজারে পর্যটকদের জন্য রাতের বিনোদনের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো হোটেলের ভেতরে বার্ষিক অনুষ্ঠান করতে গেলেও অনুমতির নামে হয়রানির শিকার হতে হয় বলে তার দাবি। তার ভাষ্য, প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে অনুষ্ঠানের তথ্য জানানোর পরও মাথাপিছু ৮০ থেকে ১০০ টাকা না দিলে অনুমতি পাওয়া যায় না। লিখিত অনুমতি ছাড়া অনুষ্ঠান করলে মাঝপথে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ওই হোটেল মালিক আরও বলেন, আগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও এখন পৌরসভাও একইভাবে হয়রানি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে গত চার বছরে কক্সবাজারে করপোরেট অনুষ্ঠান প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে বলে দাবি করেন তিনি। তার মতে, এখন করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো গাজীপুরসহ অন্য এলাকায় অনুষ্ঠান করছে, যা কক্সবাজারের রাজস্বের ওপর প্রভাব ফেলছে।
ট্যুর অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) সভাপতি আনোয়ার কামাল বলেন, ‘স্ট্রিট ফুড ছাড়া পর্যটন চলে না।’ তার মতে, কক্সবাজারে মানসম্মত স্ট্রিট ফুডের ব্যবস্থা না থাকলেও অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি হচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে জরিমানা বা বন্ধ করে দেওয়ার পরিবর্তে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিক্রেতাদের মানসম্মত খাবার তৈরি ও পরিবেশনে দক্ষ করে তোলা উচিত।
তিনি আরও বলেন, পর্যটনে স্থানীয়দের অংশগ্রহণও খুব কম। কাজের সুযোগের অভাবে অনেকে পর্যটন এলাকায় ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন বলে তার দাবি। স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যটন খাতে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।
তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের পরিচালক আবদুল কাদের মিশু বলেন, প্রাকৃতিকভাবে থাকা দর্শনীয় স্থান ছাড়া কক্সবাজারে পর্যটকদের জন্য নতুন বিনোদন ব্যবস্থা খুবই সীমিত। তার হোটেলে পর্যটকদের জন্য সন্ধ্যায় লাইভ মিউজিকের আয়োজন করা হয়। তিনি বলেন, ‘এটা ছাড়া বলা যায়, সন্ধ্যা হলেই ঘুমিয়ে পড়ে পর্যটন রাজধানী খ্যাত কক্সবাজার।’
তার মতে, পর্যটনশিল্পের বিকাশে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও সমন্বয়হীনতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী বলেন, বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করতে নাইট লাইফের ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু বছরের পর বছর চেষ্টা করেও একটি নাইট বাজার চালু করা সম্ভব হয়নি। পর্যটন করপোরেশনের উচিত বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করা এবং নতুন ধারণা ও উদ্যোগকে উৎসাহিত করা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পর্যটন করপোরেশনের ম্যানেজার ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সাধারণ সম্পাদক রায়হান উদ্দিন আহমেদ বলেন, শৈবালের লেক ও গলফ মাঠ কক্সবাজারের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র ছিল। বর্তমানে সেগুলো আর নেই। কক্সবাজারে পর্যটন করপোরেশনের চারটি হোটেল ও পাঁচটি কটেজ রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি কটেজ ও মোটেল প্রবাল বিদেশি এনজিওকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, কক্সবাজারের পর্যটনকে বিশ্বমুখী করার প্রক্রিয়া নির্ধারণে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতীতে কী হয়েছে, তা নিয়ে না থেকে সবার সমন্বিত পরামর্শ নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।
বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসন ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির উদ্যোগে তিন দিনের পর্যটন মেলায় প্রায় ৮০টি স্টল অংশ নিয়েছে। তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইস, সায়মন, সি পার্ল, গ্রিন ন্যাচার ও সিগালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মেলায় স্টল দিয়েছে। স্বল্প খরচে তারকা হোটেলের খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে দর্শনার্থীদের জন্য। এ ছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য, আচার, শুঁটকি ও পিঠাসহ বিভিন্ন পর্যটনসংশ্লিষ্ট পণ্য প্রদর্শন করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের উপপ্রশাসনিক কর্মকর্তা মুহাম্মদ ইউনূস জানান, রোববার পর্যন্ত লাবণী পয়েন্টে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলবে।
এমএম/