দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

একসময় ঝালকাঠির নদীবন্দর ঘিরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলত লবণ প্রক্রিয়াজাতকরণের কর্মযজ্ঞ। কক্সবাজারসহ উপকূলীয় অঞ্চল থেকে নৌপথে আসত অপরিশোধিত লবণ। ঘাটে নোঙর করত নৌযান, কারখানায় চলত লবণ পরিষ্কার, পরিশোধন, আয়োডিন মেশানো, শুকানো ও প্যাকেটজাতকরণের কাজ। শ্রমিকদের হাঁকডাকে মুখর থাকত পুরো এলাকা।
কালের পরিক্রমায় সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বছরের পর বছর একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী লবণশিল্পে নেমেছে বড় ধস। একসময় ছোট-বড় মিলিয়ে ২০টির বেশি লবণকল থাকলেও বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র আটটি।
বর্তমানে নিউ ঝালকাঠি সল্ট, এআরএস সল্ট, দি ক্রিসেন্ট সল্ট, লাকী সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ, ধাঁন সিড়ি সল্ট, শরীফ সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ, তাজ সল্ট ক্রাশিং ও মনিলাখ সল্ট—এই আটটি মিল চালু রয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে মিতালী, নূর, কুমিল্লা, মদিনা, মিনি ও সুরভী সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজসহ আরও কয়েকটি কারখানা।
চালু থাকা আটটি মিলের মধ্যে তিনটি আধুনিক পদ্ধতিতে এবং পাঁচটি পুরোনো প্রযুক্তিতে উৎপাদন করছে। এসব কারখানায় মাসে গড়ে ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টন এবং বছরে প্রায় ২০ হাজার ৪০০ থেকে ২৬ হাজার ৪০০ টন ভোজ্য ও শিল্প লবণ উৎপাদন হচ্ছে। আটটি মিলে প্রায় এক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, বছরে এসব মিল থেকে ২০০ কোটি টাকার বেশি লবণ বিক্রি হয়।
ব্রিটিশ আমল থেকে লবণের ব্যবসা
ঝালকাঠিতে লবণ ব্যবসার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ব্রিটিশ আমল থেকেই ঝালকাঠি ও আশপাশের এলাকায় এ ব্যবসা চলে আসছে। নদীপথের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ঝালকাঠি একসময় দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। জেলা শহরটি একসময় ‘দ্বিতীয় কলকাতা’ হিসেবেও পরিচিত ছিল।
বাসন্ডা নদীর দুই তীরজুড়ে একসময় গড়ে উঠেছিল বহু সনাতন পদ্ধতির লবণকল। কক্সবাজারসহ উপকূলীয় অঞ্চল থেকে নৌপথে কাঁচা লবণ এনে স্থানীয় কারখানায় তা পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাত করা হতো। পরে বরিশাল বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হতো সেই লবণ।
কমেছে মিল, কমেনি উৎপাদনের গুরুত্ব
কারখানার সংখ্যা কমলেও ঝালকাঠিতে এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লবণ প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে। কক্সবাজার থেকে নৌপথে আনা অপরিশোধিত লবণ প্রথমে কারখানায় পরিষ্কার করা হয়। এরপর বিভিন্ন ধাপে তা পরিশোধন, শুকানো ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়। খাবার লবণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আয়োডিন যুক্ত করে প্যাকেটজাত ও বাজারজাত করা হয়।
তবে অধিকাংশ স্থানীয় কারখানায় এখনও পুরোনো প্রযুক্তি ও সনাতন পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। মিল মালিকদের ভাষ্য, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। ব্যাংকঋণ ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন না পাওয়ায় পুরোনো কারখানাগুলোর আধুনিকায়ন সম্ভব হচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যয় ও সময় বাড়ছে এবং বড় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা।
দেশের বিভিন্ন জেলায় যায় ঝালকাঠির লবণ
ঝালকাঠিতে উৎপাদিত লবণ শুধু স্থানীয় বাজারেই বিক্রি হয় না। নৌ ও সড়কপথে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। ব্যবসায়ীদের দাবি, একসময় বৃহত্তর ফরিদপুর, খুলনা, রাজশাহী, বরগুনা, ভোলা, যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া ও নারায়ণগঞ্জসহ ১৭টি জেলা ও বিভিন্ন অঞ্চলে ঝালকাঠির লবণ সরবরাহ করা হতো।
লবণের ব্যবহার রান্নাঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মাছের ঘের, শুঁটকি, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন শিল্প ও কৃষিকাজেও এর ব্যবহার রয়েছে। ফলে এ শিল্পের সঙ্গে মিল মালিক ও শ্রমিকের পাশাপাশি আড়তদার, পরিবহন শ্রমিক, নৌযান মালিক, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরাও যুক্ত।
আমদানি ও বড় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা
স্থানীয় মিল মালিকদের অভিযোগ, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বড় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো ক্রমেই চাপে পড়ছে।
চীন, ভারত ও মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা শিল্প লবণ ও বিভিন্ন ধরনের সোডিয়ামভিত্তিক লবণের সঙ্গেও দেশীয় কারখানাগুলোর প্রতিযোগিতা চলছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের দাবি, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন ও বাজারজাত করতে পারায় তাদের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম। অন্যদিকে পুরোনো প্রযুক্তি, শ্রমনির্ভর উৎপাদন ও অর্থসংকটের কারণে ছোট কারখানাগুলো টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।
কমেছে শ্রমিকদের কাজ
লবণের চাহিদা থাকলেও এর সুফল শ্রমিকদের জীবনে খুব একটা পৌঁছাচ্ছে না বলে অভিযোগ শ্রমিকদের। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করেও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
শ্রমিক আব্দুল লতিফ বলেন, ‘আগে কাজ বেশি ছিল, প্রায় প্রতিদিনই কাজ পাওয়া যেত। এখন কাজ কমে যাওয়ায় সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন কাজ করেই থাকতে হয়। এতে সংসারের খরচ চালাতে কষ্ট হচ্ছে।’
রুস্তম আলী বলেন, ‘আগে লবণের মিলে কাজের চাপ অনেক বেশি ছিল। বছরের বেশিরভাগ সময় নিয়মিত কাজ পাওয়া যেত। এখন মিল কমে যাওয়ায় কাজের সুযোগও কমেছে। কোনো সপ্তাহে কয়েকদিন কাজ থাকে, আবার কোনো সময় কাজ না থাকায় বসে থাকতে হয়।’
আরেক শ্রমিক রিপন সিকদার বলেন, ‘আগের তুলনায় কাজ অনেক কমে গেছে। যে টাকা পাই, তা দিয়ে বর্তমানে সংসার চালানো কষ্টকর। বাজারে সবকিছুর দাম বাড়লেও আমাদের আয় সেই তুলনায় বাড়েনি।’
ঝালকাঠির লবণশিল্পে একসময় প্রায় দুই হাজার শ্রমিক কাজ করলেও বর্তমানে এ সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় এক হাজারে। লবণ পরিষ্কার, বস্তা বহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, শুকানো, প্যাকেটজাতকরণ ও পরিবহনের মতো কাজে এসব শ্রমিক যুক্ত।
জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ে চাপে উদ্যোক্তারা
লবণশিল্পের জন্য কাঁচামাল পরিবহন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহ্যগতভাবে কক্সবাজারসহ উপকূলীয় অঞ্চল থেকে নদীপথে কাঁচা লবণ ঝালকাঠিতে আসত। কিন্তু বর্তমানে পরিবহন ব্যয়, নৌপথের নানা সীমাবদ্ধতা ও সড়কপথে অতিরিক্ত খরচে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
মেসার্স নিউ ঝালকাঠি সল্ট মিলের মালিক আবু বক্বর সিদ্দিক বলেন, ‘আগে সনাতন পদ্ধতিতে লবণ পরিশোধন করা হতো। এতে খরচ বেশি পড়ত। বর্তমানে আধুনিক মেশিনের মাধ্যমে পরিশোধন করায় খরচ কিছুটা কম হয়। কিন্তু বর্তমানে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আবার খরচ বেড়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের লবণ যে পরিমাণে পরিশোধন করা হয়, তাতে চাহিদা মেটানো সম্ভব। কারও প্রয়োজন হলে অর্ডার দিয়ে ৫ থেকে ৭ দিন সময় দিলে ৬ হাজার টনের বেশি লবণ দেওয়া সম্ভব।’
মেসার্স তাজ সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক মো. ইলিয়াছ বলেন, ‘বর্তমানে অবস্থা তেমন ভালো না। বেচাকেনা কম। সনাতন পদ্ধতিতে লবণ পরিশোধন করতে খরচ বেশি হয়। আবার তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কক্সবাজার থেকে লবণ আনতে খরচ বেশি পড়ে। এরপর খুলনা আর ঢাকার চাপে আগের তুলনায় তেমন বিক্রি করতে পারি না।’
সহজ শর্তে ঋণের দাবি
মিল মালিকদের অন্যতম প্রধান দাবি সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ। তাদের বক্তব্য, আধুনিক মেশিন, সেন্ট্রিফিউজ, প্যাকেটজাতকরণ ইউনিট ও অন্যান্য প্রযুক্তি স্থাপনে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অনেকেই প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না।
ফলে পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়েই উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন সময় ও শ্রম ব্যয় বাড়ছে, একই সঙ্গে পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও কমছে।
একটি শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে বহু মানুষের জীবন
ঝালকাঠির লবণশিল্পকে শুধু কয়েকটি কারখানার ব্যবসা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। একটি লবণের বস্তা কক্সবাজার থেকে নৌপথে ঝালকাঠিতে আসার পর এর সঙ্গে যুক্ত হন নৌযান মালিক, মাঝি, ঘাট শ্রমিক, কারখানা শ্রমিক, মেশিন অপারেটর, প্যাকেটজাতকারী, আড়তদার, পরিবহন শ্রমিক, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ী।
কারখানা কমে গেলে কর্মসংস্থান কমে, উৎপাদন কমলে আড়ত ও পরিবহন ব্যবসায়ও প্রভাব পড়ে। শ্রমিকের আয় কমলে স্থানীয় বাজারেও এর প্রভাব পড়ে।
ঝালকাঠির লবণশিল্পের বড় শক্তি এর দীর্ঘ ঐতিহ্য, দক্ষ শ্রমিক, নদীপথের ঐতিহাসিক সুবিধা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাজারজাতকরণের অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে পুরোনো প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব, উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন সমস্যা, শ্রমিকদের অনিশ্চিত আয় এবং বড় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা এ শিল্পের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বিসিকের সহযোগিতার আশ্বাস
ঝালকাঠি বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মো. আল আমিন বলেন, ‘জেলার লবণ কারখানার উদ্যোক্তারা পুরোনো যন্ত্রপাতি ও যানবাহন যোগাযোগব্যবস্থার কারণে সমস্যায় পড়ছেন। শিল্পটি যাতে হারিয়ে না যায়, সে জন্য আর্থিক ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে সহযোগিতার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘লবণের মান বজায় রাখতে নিয়মিত কারখানা পরিদর্শন করা হয়। সনাতন পদ্ধতির মিলগুলো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।’
বিসিকের এই কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে কারখানাগুলোতে যে পরিমাণ লবণ বাজারজাত করা হয়, তাতে শুধু জেলার চাহিদা নয়, পুরো বরিশাল বিভাগের চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়।
যে আই