দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

গাইবান্ধা জেলায় সার বিক্রয়ের অনুমোদন ঘিরে অভূতপূর্ব প্রতিযোগিতা দেখা দিয়েছে। মাত্র ৮৫টি ডিলারশিপের জন্য জমা পড়েছে ১১৭৬টি আবেদন। অর্থাৎ প্রতি পদে গড়ে প্রায় ১৪ জন প্রার্থী লড়ছেন। শুধু সংখ্যার বিচারে এটি একটি সাধারণ ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা মনে হলেও স্থানীয় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ, নগদ লেনদেনের প্রবাহ, সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেটের স্বার্থ-সব মিলিয়েই এই ডিলারশিপকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অস্বাভাবিক হুড়োহুড়ি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, জেলার সাত উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৫১টি আবেদন জমা পড়েছে সুন্দরগঞ্জে। এরপর রয়েছে গাইবান্ধা সদর উপজেলায় ২৩১টি, গোবিন্দগঞ্জে ১৮৩টি, সাদুল্লাপুরে ১৫৪টি, সাঘাটায় ১৩১টি, ফুলছড়িতে ১১৫টি এবং পলাশবাড়ীতে ১১১টি।
সরকারি হিসাবে সার বিক্রির কমিশন সীমিত। পরিবহন খরচ, নিজস্ব গুদাম ভাড়া, শ্রমিক মজুরি ও অন্যান্য ব্যয় সামাল দিয়ে খাতা-কলমে বড় মুনাফার সুযোগ খুব একটা নেই। তাহলে কেন এই লাইসেন্স পেতে এত প্রার্থীর ভিড়? এই প্রশ্নই এখন জেলার কৃষি অর্থনীতির কেন্দ্রে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সার ডিলারশিপ মানে কেবল একটি দোকান পরিচালনার অনুমতি নয়। গ্রামীণ অর্থনীতিতে সারের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ মানেই বিপুল নগদ টাকার লেনদেন, সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং সিন্ডিকেটের অদৃশ্য সুযোগ। একজন ডিলার বছরে কত টন সার বরাদ্দ পান, কোন মাসে কত দামে বিক্রি করেন, সরকারি কোটা বাইরে কী পরিমাণ সার কালোবাজারে যায়—এই হিসাব জনসমক্ষে নেই। আর সেই অজানা অঙ্কই এই ডিলারশিপকে করে তুলেছে এক সোনার হরিণ।
রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি নতুন নয়। গাইবান্ধার স্থানীয় রাজনৈতিক মহল ও কৃষি বিভাগের সূত্রমতে, আবেদনকারীদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা দলীয় পরিচয় ও স্থানীয় প্রভাব ব্যবহার করে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কৃষি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, আবেদনপত্রের সঙ্গে দলীয় পরিচয়পত্র না থাকলেও স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সুপারিশ লক্ষ্য করা যায়। কেউ কেউ আবার তদবিরও করছেন।
বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও পিছিয়ে নেই। স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত-শিবির সমর্থিত অনেক ব্যবসায়ীও আবেদন করেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একাধিক সূত্র জানায়, কোনো কোনো উপজেলায় প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যরা সরাসরি আবেদন না করে আত্মীয়-স্বজনের নামে আবেদন জমা দিয়েছেন। ফলে মাঠপর্যায়ে প্রকৃত সক্ষমতা যাচাইয়ের কাজটি এখন অগ্নিপরীক্ষার মুখে।
সম্প্রতি জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমে সার বিতরণ ও ডিলারশিপ নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তাতে উঠে এসেছে দেশের বিভিন্ন জেলায় সারের কৃত্রিম সংকট, ডিলারদের বিরুদ্ধে ওজনে কম দেওয়া, কালোবাজারে সার বিক্রি এবং বরাদ্দ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ। কোথাও কোথাও কৃষকরা সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় ডিলারশিপের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ যিনি ডিলার হবেন, তিনি শুধু ব্যবসায়ী নন, স্থানীয় কৃষি অর্থনীতির এক নিয়ন্ত্রক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সারের সরবরাহ ও বিতরণে স্বচ্ছতা না থাকলে সংকট আরও বাড়বে। গাইবান্ধার এই ১৪ গুণ আবেদনের ঘটনা তারই বড় উদাহরণ।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আসাদুজ্জামান জানান, আবেদন গ্রহণ শেষে বর্তমানে মাঠপর্যায়ে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। তিনি বলেন, নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করে দ্রুত জেলা প্রশাসকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। যোগ্য ও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বাছাই করা হবে।
তবে আবেদনকারীর নিজস্ব গুদামের সক্ষমতা, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ এবং কৃষিভিত্তিক নীতিমালা যাচাই কতটা নিরপেক্ষ থাকবে, তা নিয়েও গুঞ্জন চলছে। স্থানীয় কৃষকদের একাংশ বলছেন, তাঁরা চান এমন ডিলার হোক, যিনি সঠিক দামে, সঠিক ওজনে সার দেবেন। কিন্তু রাজনৈতিক চাপে যদি অযোগ্য লোক লাইসেন্স পান, তাহলে কৃষকরাই ভুক্তভোগী হবেন।
এখন প্রশ্ন একটাই। প্রভাব ও লবিংয়ের চাপে সঠিক ব্যবসায়ী ও কৃষকের প্রকৃত সেবকেরা লাইসেন্স পাবেন না যনাকি বিশাল এই ভিড়ের পেছনে কেবল সিন্ডিকেটের স্বার্থই রক্ষা পাবে? গাইবান্ধার সার ডিলারশিপ বিতরণের এই ঘটনা এখন জাতীয় পর্যায়ের নজরে। বাছাই কমিটির টেবিলে যে সিদ্ধান্ত হবে, তা শুধু ৮৫ জন ডিলারের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং জেলার কৃষক, কৃষি অর্থনীতি এবং সার বিতরণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষাও দেবে।
কেএম