দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

একটি ছোট্ট টিনের ঘর। ঘরের কোণে পাতা কাঠের চৌকিতে সাজানো বিস্কুট, চানাচুর আর কেকের প্যাকেট। টিনের বেড়ায় ঝুলছে আরও কিছু শুকনো খাবার। পাশে তিন-চারটি প্লাস্টিকের চেয়ার। কাঠের টেবিলে একটি ফ্লাস্ক ও কয়েকটি চায়ের কাপ। আড়াই থেকে তিন হাজার টাকার এই সামান্য পণ্য নিয়েই বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছেন ২৮ বছর বয়সী শারীরিক প্রতিবন্ধী যুবক মো. হারুন।
উচ্চতায় মাত্র তিন ফুট হলেও হারুনের কাঁধে এখন চার সদস্যের সংসারের দায়িত্ব। দিনভর চা ও মুদিপণ্য বিক্রি করে তাঁর লাভ হয় মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। এই সামান্য আয় এবং তিন মাস পরপর পাওয়া আড়াই হাজার টাকা প্রতিবন্ধী ভাতার ওপর নির্ভর করেই কোনোমতে দিন কাটছে হারুন, তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মা ও এক ভাগনির।
সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার খাসরাজবাড়ী চরে ছিল হারুনদের ভিটেমাটি। কয়েক বছর আগে তীব্র নদীভাঙনে বাপ-দাদার সেই বসতভিটা যমুনার গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সহায়-সম্বল হারিয়ে বর্তমানে অন্যের সাত শতাংশ জমিতে কোনোমতে একটি টিনের ছাপড়া তুলে আশ্রয় নিয়েছেন তাঁরা।
শৈশবে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন হারুন। নদীভাঙনের কঠিন বাস্তবতায় সেখানেই থেমে যায় তাঁর পড়াশোনা। হারুনের দুই বোনের মধ্যে একজনের বিয়ে হয়েছে গ্রামে। অন্যজন জীবিকার তাগিদে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। বৃদ্ধ বাবা সাত্তার শেখকে সঙ্গে নিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দোকানে সময় দেন হারুন।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। চার বছর আগে বিয়ে করেছিলেন হারুন। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে এক বছরের মাথায় স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে যান।
হারুন বলেন, ‘টাকা-পয়সা না থাকার কারণেই সংসারটা টেকেনি। তবে এখন আর নিজের কথা ভাবি না, বাবা-মা বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। তাঁদের মুখের দিকে তাকালে আর কষ্ট সহ্য হয় না।’
এত বঞ্চনা ও অভাবের মধ্যেও নিজের জন্য সরকারের কাছে আলাদা কোনো অনুদান চাননি হারুন। বরং চরের মানুষের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নদীভাঙনে আমাদের মতো অনেকের ঘরবাড়ি চলে গেছে। চরের মানুষের কষ্ট অনেক বেশি। সরকার যদি আমাদের এই দুর্গম চরের অসহায় মানুষগুলোর স্থায়ী পুনর্বাসনে নজর দেয়, তবেই আমরা খুশি।’
যমুনার তীরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এক কাপ চা কিংবা কয়েক টাকার বিস্কুট বিক্রির অপেক্ষায় বসে থাকেন হারুন। তীব্র নদীভাঙন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও ভাঙা সংসারের কষ্ট পেছনে ফেলে সামান্য আয়েই প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
এমএম/