একদিকে কোটি কোটি বাঙালির দিকে তাক করে থাকা ট্যাঙ্ক, কামান আর বোমারু বিমান, অন্যদিকে মুক্তিকামী মানুষের স্বাধীনতার ডাক শোনার অপেক্ষা। নির্দেশ পেতে নেতার মুখের দিকে তাকিয়ে সবাই। এর মধ্যেই এলো ৭ মার্চ। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু বিমুখ করলেন না। ঐতিহাসিক ভাষণে ডাক দিলেন স্বাধীনতার। কেমন ছিলো সেই মুহূর্ত, কেমন ছিলো সেই প্রেক্ষাপট—এসব প্রশ্নে উত্তাপের অনুভূতি পাওয়া যায় তৎকালীন ছাত্র নেতাদের কথায়।
দীর্ঘদিনের শোষণ, নিপীড়নে ফুঁসে ওঠা বাঙালিকে একদিকে পাকিস্তানিরা গুলি করে হত্যা করেছে, আরেকদিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখেছে বঙ্গবন্ধুর ওপর, রেসকোর্স ময়দানে তিনি কী বলবেন সেদিকে।
নির্মলেন্দু গুণ যেভাবে কবিতায় বলেছেন, সেদিন অনেকটা সেভাবেই মঞ্চে উঠেছিলেন কবি, গর্জে উঠেছিলো তার কণ্ঠ। “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম”— আগুনঝরা, অপ্রতিরোধ্য এ ডাকে উজ্জীবিত বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাক হায়েনাদের করাল গ্রাস থেকে দেশমাতৃকাকে রক্ষার যুদ্ধে।
শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কীভাবে এসেছিলো সেই ঘোষণা? বঙ্গবন্ধুর জন্য খুব কী সহজ ছিল সেই উচ্চারণ? ঐতিহাসিক ৭ মার্চের আগের দিন রাতে কী অস্থির পায়চারিতে নির্ঘুম ছিলেন বঙ্গবন্ধু ?—এসব প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগঠন (ডাকসু)’র তৎকালীন সাবেক সহসভাপতি আসম আব্দুর রব দেশ টিভির সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, “(বঙ্গবন্ধু) পায়চারি করতে থাকলেন ঘরের মধ্যে। রাত ৪টা পর্যন্ত উনি ঘুমাননি এবং মঞ্চে যখন আসেন তখন কারো সঙ্গে কথা বলছিলেন না। যেহেতু উনাকে গুলি করে দিতে পারে, তাই আমরা চতুর্দিক থেকে তাকে (এমনভাবে) ঘিরে রেখেছিলাম।”
মুক্তিকামী গোটা জাতিকে ভবিষ্যতের দিক নির্দেশনা দিতে বঙ্গবন্ধু তার ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে কী বলতে পারেন, কী বলা উচিৎ, সেসব বিষয়ে কোনো আলোচনা করেছিলেন কিনা—এ প্রশ্নের জবাবে ডাকসু’র সাবেক সহসভাপতি (১৯৬৯) ও বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ দেশ টিভিকে বলেন, “বঙ্গবন্ধুর প্রিয় সহধর্মিণী, আমাদের শ্রদ্ধেয়া ভাবী বলেছিলেন, তুমি ঘুমাও। তুমি যা বিশ্বাস করো তাই বলো, সেটিই মানুষ গ্রহণ করবে। উনি বিশ্বাস করেছেন স্বাধীনতার কথা। (আর) তা-ই বলেছিলেন।”
তিনি আরো বলেন, “বঙ্গবন্ধুর ভাষণ নিয়ে যে চারটি দফা, সেই চারটি দফা নিয়ে তিনি তার রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে নিয়েছিলেন।”
এ প্রসঙ্গে আসম রব বলেন, “যে কথাগুলো আলোচনা করেছেন, বাকি যে ভাষাগুলো সমস্ত এ টু জেড তোতা পাখির মতো আমাদের শিখিয়ে দেয়া না। উনার নিজের ভিতর থেকে সেগুলো এসেছিলো।”
যে স্বাধীনতার তাড়না বঙ্গবন্ধুকে জেল-জুলুম—কোনো কিছু দিয়ে আটকাতে পারেনি, সেই স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে খুব বেশি ভাবতে হয়নি তাকে।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, “যাতে বঙ্গবন্ধুকে কেউ বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে কেউ আখ্যায়িত করতে না পারে সেজন্য তিনি বললেন চারটি শর্ত দিয়ে। বঙ্গবন্ধু জানতেন ওরা ক্ষমতা হস্তান্তরও করবে না, সামরিক আইন প্রত্যাহারও করবে না আর তিনিও বিচ্ছিন্নতাবদী হবেন না। কারণ সময়ে ওরা একদিন আমাদেরকে আক্রমণ করবে।”
ক্যান্টনমেন্টে তখন প্রস্তুত ছিলো ট্যাঙ্ক, কামান আর বোমারু বিমান। বঙ্গবন্ধু সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে রেসকোর্সেই হয়তো হামলা চালিয়ে সব শেষ করার আশঙ্কা ছিলো অনেকের। তাই বঙ্গবন্ধু ছিলেন সাবধানী।
তৎকালীন ছাত্রনেতা আসম আব্দুর রব বলেন, “আমাদের দায়িত্ব ভাগ করা ছিলো। কামরুল আনাম খসরু আর মন্টু। তাদেরও দায়িত্ব ভাগ করা ছিলো: সিকিউরিটি। আর আমার দায়িত্ব ছিলো বঙ্গবন্ধু যেটা আলোচনা করছেন আগের দিন রাত্রে, কোনো কারণে যদি খেই হারিয়ে ফেলেন ইমোশনাল সেন্টিমেন্টের কারণে তখন মনে করিয়ে দেয়া, ধরিয়ে দেয়া। আমি ওনার পাশে একদম বসা ছিলাম। এটি ছিলো আমার দায়িত্ব।”
আর তোফায়েল আহমেদ বলেন, “তার (বঙ্গবন্ধুর) জানা ছিলো ক্যান্টনমেন্টের ট্যাঙ্ক তৈরি, তার জানা ছিলো বোমারু বিমান তৈরি। বঙ্গবন্ধু যদি এ ধরনের ইউডিআই (ইউনিল্যাটারাল ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স) করেন, তাহলে বোমা মেরে লক্ষ লক্ষ লোককে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। তিনি সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। স্বাধীনতার ঘোষণাও দিলেন আবার তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত হবার যে একটা বদনাম তার থেকে নিজেকে রক্ষা করেছেন।”
ইতিহাসে অদ্বিতীয় সেই ভাষণ হওয়ার পর মানবঢাল তৈরী করে বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিলেন সে সময়ের ছাত্রনেতারা।