বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে গত পাঁচ বছরে মোট ২৮ লাখ মেট্রিক টন কয়লা তোলা হয়েছে। সর্বশেষ দুই বছর থেকে লাভের মুখ দেখলেও যাদের রক্তঘাম করা শ্রমে কয়লা উপরে উঠে আসে, তাদের অনিশ্চিত জীবনে কখনো নিশ্চয়তা আসে না।
জেনারুল এ কয়লা খনির সাতশ’রও বেশি শ্রমিকের একজন, যাদের শ্রমে জমাটবাধা কয়লা খসে খসে পড়ে। কিন্তু একবার হিতে বিপরীত হলো, পুরো চাকটাই পড়লো জেনারুলের শরীরের ওপর।
সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার স্মৃতিস্মরণ করতে গিয়ে জেনারুল বলেন, “যে চাকটা ১৫ ফুট ফাঁক করার কথা ছিলো সেটাই ফাঁক করতে গিয়ে প্রায় ২৭/২৮ ফুট ফাঁক হয়ে গেছে। এতো উপর থেকেই চাকটা আমার ওপর খসে পড়েছে।”
এ ঘটনার সাড়ে তিন বছর পর সরকারি সাহায্য হিসেবে পেট্রোবাংলার বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক হোসেন মনসুর জেনারুলের হাতে ৩ লাখ টাকা দেন। কিন্তু তারপরও কষ্টে তার চোখের পানি চলে আসে। কারণ এই ক্ষতিপূরণে তার ঘাঁ হয়ে যাওয়া কাটা পা আর জোড়া লাগবে না।
এতো ঝুঁকির কথা জেনেও অভাবের তাড়নায় জেনারুল, হাফিজ, সিরাজ অথবা মোমিনরা ৮ ঘন্টার জন্য আবার মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নেয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
এ প্রসঙ্গে কয়লা খনির এক শ্রমিক বলেন, “আমরা প্রত্যেক দিন মরে যাই আবার প্রত্যেক দিন জীবিত হই। কয়লা খনিতে যে মালির কাজ করে তারাই পায় ৩ লক্ষ ৭৬ হাজার টাকা। আর আন্ডারগ্রাউন্ডে জীবনের সাথে পাঞ্জা লড়ে আমরাও এতো টাকা পাই না।”
আর একজন শ্রমিক বলেন, “বেতনের জন্য প্রতি বছর আমাদের আন্দোলন করতে হয়। এতো কষ্ট করে কাজ করার পরও কেনো আমাদের এই আন্দোলন করতে হয়?”
শ্রমিকরা পরিচ্ছন্ন শরীর নিয়ে কয়লা খনিতে ঢুকলেও কালিমাখা শরীর নিয়ে বেরিয়ে আসছেন। ঘন অন্ধকারে জীবন-মৃত্যু পাশাপাশি হেঁটে বেড়ানোর মাঝেই ঘটে বিদ্রোহ, বন্ধ হয়ে যায় সবকিছু। স্থায়ী চাকরির দাবিতে সোচ্চার হন শ্রমিকরা।
কর্তৃপক্ষও মনে করে, এ সমস্যার সমাধান দরকার। কিন্তু তাদের কথায় কান পাতেন না সরকার।
এ ব্যাপারে বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো: কামরুজ্জামান দেশ টিভিকে বলেন, “তারা পরিশ্রম করে, দিন রাত খেটে কয়লা তুলছে। সুতরাং তাদের ন্যায্য পাওনাগুলো যদি এনসিওরড হয় তাহলে হয়তো অসন্তোষ কমবে।”
প্রকল্পে ২০৭ জন চীনা শ্রমিকের সাথে ঠিকাদারের মাধ্যমে দিনভিত্তিক ৭২৭ জন স্থানীয় শ্রমিক কাজে করেন। ফলে ঠিকাদারের খাতায় শুধু দিনের হিসেব আর কয়লার হিসেবই ওঠে।