ইসলাম

ksrm

মঙ্গলবার, ১৫ মে, ২০১৮ (১৬:১০)

সিয়াম বা রোযা রাখার উপকারিতা

ইফতাররত মুসল্লি

আরবী সিয়াম শব্দের অর্থ বিরত রাখা, বিরত থাকা। বাংলাদেশে সিয়ামকে জনপ্রিয় ভাবে রোযা নামে ডাকা হয়। ইসলামী পরিভাষায় রোযা বলা হয়, আল্লাহর নির্দেশ পালনের উদ্দেশ্যে সুবহে সাদিকের প্রারম্ভ (ফজর) হতে সুর্যাস্ত (মাগরিব) পর্যন্ত কোন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির নিয়তসহ সর্ব প্রকার পানাহার, গুনাহের কাজ থেকে থেকে বিরত থাকাকে রোযা বা সিয়াম বলে।

সিয়াম বা রোযা রাখার অনেকগুলো আধ্যাত্মিক ও শারিরীক উপকার রয়েছে।

আধ্যাত্মিক উপকারসমূহ

এক. সিয়াম পালনকারীর সাথে আল্লাহ তায়া’লার সম্পর্ক স্থাপন:

এক হাদীসে কুদসি’তে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য, কিন্তু রোযা শুধু আমার জন্য, আমিই তার প্রতিদান দেব। (মুসলিম)। এ হাদীস দ্বারা আমরা অনুধাবন করতে পারি নেক আমলের মাঝে রোযা পালনের গুরুত্ব আল্লাহর কাছে কত বেশি।

তাই সাহাবি আবু হুরায়রা রা. যখন বলেছিলেন, হে রাসূলুল্লাহ! আমাকে অতি উত্তম কোন নেক আমলের নির্দেশ দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : তুমি রোযা পালন করবে। মনে রেখ এর সমমর্যাদার কোন আমল নেই। (নাসায়ি)

দুই. রোযা আদায়কারী বিনা হিসাবে প্রতিদান লাভ করে থাকেন: কিন্তু অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগি ও সৎ কর্মের প্রতিদান বিনা হিসাবে দেয়া হয় না। বরং প্রত্যেকটি নেক আমলের পরিবর্তে আমলকারীকে দশ গুণ থেকে সাত শত গুণ পর্যন্ত প্রতিদান দেয়া হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মানব সন্তানের প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান দশ থেকে সাত শত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, কিন্তু সিয়ামের বিষয়টা ভিন্ন। কেননা রোযা শুধু আমার জন্য আমিই তার প্রতিদান দেব। (মুসলিম)

তিন. রোযা ঢাল ও কুপ্রবৃত্তি থেকে সুরক্ষা:

রোযা পালনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কু-প্রবৃত্তি থেকে বেঁচে থাকার দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, হে যুবকেরা ! তোমাদের মধ্যে যে সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা বিবাহ দৃষ্টি ও লজ্জাস্থানের সুরক্ষা দেয়। আর যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে না সে যেন রোযা পালন করে। কারণ এটা তার রক্ষা কবচ। (বোখারি ও মুসলিম)

এমনিভাবে রোযা সকল অশ্লীলতা ও অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিরত রাখে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

রোযা হল ঢাল। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে রোযা পালন করবে সে যেন অশ্লীল আচরণ ও শোরগোল থেকে বিরত থাকে। যদি তার সাথে কেউ ঝগড়া বিবাদ কিংবা মারামারিতে লিপ্ত হতে চায় তবে তাকে বলে দেবে আমি রোযা পালনকারী। (মুসলিম)

চার. রোযা জাহান্নাম থেকে বাঁচার ঢাল:

যেমন হাদীসে এসেছে, রোযা হল ঢাল ও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার মজবুত দুর্গ। (আহমদ)

বোখারি ও মুসলিমের হাদীসে এসেছে, যে ব্যক্তি একদিন আল্লাহর পথে রোযা পালন করবে আল্লাহ তার থেকে জাহান্নামকে এক খরিফ (সত্তুর বছরের) দুরত্বে সরিয়ে দেবেন। (মুসলিম)

এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা বহু রোযা পালনকারীকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।

পাঁচ. রোযা হল জান্নাত লাভের পথ:

হাদীসে এসেছে, আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত যে তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে এমন একটি কাজের নির্দেশ দিন যার দ্বারা আমি লাভবান হতে পারি। তিনি বললেন : তুমি রোযা পালন করবে। কেননা, এর সমকক্ষ কোন কাজ নেই। (নাসায়ি)

রোযা পালনকারীদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহের আরেকটি দৃষ্টান্ত হল তিনি রোযা পালনকারীদের জন্য জান্নাতে একটি দরজা নির্দিষ্ট করে দেন। যে দরজা দিয়ে রোযা পালনকারীরা ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করবে না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে একটি দরজা রয়েছে। যার নাম রইয়ান। কেয়ামতের দিন রোযা পালনকারীরাই শুধু সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। তাদের ছাড়া অন্য কেউ সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। সেদিন ঘোষণা করা হবে, রোযা পালনকারীরা কোথায় ? তখন তারা দাঁড়িয়ে যাবে সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করার জন্য। যখন তারা প্রবেশ করবে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে ফলে তারা ব্যতীত অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। (বোখারি ও মুসলিম)

ছয়. রোযা পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের চেয়েও উত্তম

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যার হাতে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবন সে সত্তার শপথ, রোযা পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহ তাআলার কাছে মেশকের ঘ্রাণ হতেও প্রিয়। (বোখারি ও মুসলিম)

সাত. রোযা ইহকাল ও পরকালের সাফল্যের মাধ্যম:

যেমন হাদীসে এসেছে, রোযা পালনকারীর জন্য দুটি আনন্দ : একটি হল ইফতারের সময় অন্যটি তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের সময়। (বোখারি ও মুসলিম)

আট. রোযা কেয়ামতের দিন সুপারিশ করবে:

হাদীসে এসেছে, আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রোযা ও কুরআন কেয়ামতের দিন মানুষের জন্য এভাবে সুপারিশ করবে যে, রোযা বলবে হে প্রতিপালক ! আমি দিনের বেলা তাকে পানাহার ও যৌনতা থেকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ কবুল কর। কুরআন বলবে হে প্রতিপালক ! আমি তাকে রাতে নিদ্রা থেকে বিরত রেখেছি তাই তার ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ কবুল কর। তিনি বলেন, অতঃপর উভয়ের সুপারিশই কবুল করা হবে। (আহমদ)

সিয়াম সাধনার শারীরিক উপকার

রোজা রাখার মাধ্যমে মানসিক ও শারীরিক উভয় দিক থেকেই উপকার সাধন হয়। যেহেতু রোজার মাধ্যমে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় স্বেচ্ছায় পানাহার থেকে বিরত থাকতে হয় এবং রিপু দমন করে রাখতে হয়, সেহেতু রোজার মধ্য দিয়ে নিজের ক্ষুধা ও রিপুর উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের প্রশিক্ষণ হয়ে যায়। ফলে, অতিরিক্ত খাওয়া এবং রিপুর তাড়না থেকে বিরত থাকা সহজ হয়। এছাড়া সমাজের গরীব মানুষ যারা তিন বেলা খেতে পারে না, ধনীদের পক্ষে তাদের মানসিক অবস্থা বুঝা এবং তাদের প্রতি অধিক সহানুভূতিশীল হওয়ার মানসিক পরিবর্তনও হয়। অনেক রোজাদারের জবানবন্দী থেকে জানা যায় যে, তারা রোজা রেখে এক ধরণের আত্মিক ও মানসিক প্রশান্তি অনুভব করেন।

রোজার শারীরিক উপকারের মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো: শরীরের মেদ কমা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে উঠা। এর প্রধান কারণ হলো, ইসলামের রোজা রাখার পদ্ধতি। পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিতেও রোজা রাখার রীতি আছে। তাদের রোজা রাখার নিয়মও বিভিন্ন। রোজার নিয়ম যদি এমন হত যে ২৪ ঘন্টাই পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে, সেক্ষেত্রে শরীর অতিরিক্ত পানি হারাতো এবং রক্তে গ্লুকোজ মাত্রাতিরিক্ত কমে যেতো। ফলে মস্তিষ্ক নিস্তেজ হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিতো। এছাড়াও শরীরের অন্যান্য অঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকত। কিন্তু মুসলিমদের রোজার একটি সুন্দর নিয়ম হলো, রাতের বেলায় সে যত ইচ্ছে পানাহার করতে পারবে। ফলে শরীর কখনও উক্ত অবস্থা পর্যন্ত অগ্রসর হয় না এবং আশংকাজনক হারে দুর্বল হয় না। এছড়াও যেতেহু ইফতার ও সাহরীর জন্য কোন নির্দিষ্ট ধরণর খাদ্য (যেমন: শুধু আমীষ, শুধু ফল ইত্যাদি) বেঁধে দেয়া হয়নি সেহেতু মুসলিমদের শরীরের প্রয়োজনীয় উপদানের ঘাটতির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা থাকে না।

রজমান মাস ধূমপায়ীদের জন্য ধূমপান ত্যাগ করার একটি সুবর্ণ সুযোগ। একজন রোজাদার যেহেতু সারাদিন ধূমপানের সুযোগ পাচ্ছে না, সেহেতু সে যদি রাতের বেলায়ও ধূমপান থেকে বিরত থাকতে পারে তাহলে এক মাসের এই সংযমের মধ্য দিয়ে সে ধূমপান ত্যাগ করতেও সক্ষম হবে।

রোযা কি মানব শরীরে কোন ক্ষতি করে?

১৯৫৮ সালে ঢাকা কলেজে ডাঃ গোলাম মোয়াজ্জাম সাহেব কর্তৃক মানব শরীরের উপর রোযার প্রভাব সম্পর্কে গবেষণা চালানো হয়। তাতে প্রমাণিত হয় যে, রোযার দ্বারা মানব শরীরের কোন ক্ষতি হয় না কেবল ওজন সামান্য কমে, তাও উল্ল্যেখযোগ্য কিছুই নয়। বরং শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমাতে এইরুপ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের খাদ্য নিয়ন্ত্রন তথা ডায়েট কন্ট্রোল অপেক্ষা বহুদিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ। তৎকর্তৃক ১৯৬০ সালে গবেষণায় এটাও প্রমাণিত হয় যে, যারা মনে করে থাকেন যে, রোযা দ্বারা পেটের শূল বেদনা বৃদ্ধি পায় তাদের এই ধারণা নিতান্ত অবৈজ্ঞানিক। কারণ উপবাসে পাকস্থলীর এসিড কমে এবং খেলেই এটা বাড়ে। এই অতি কথাটা অনেক চিকিৎসকই চিন্তা না করে শূল বেদনা রোগীকে রোযা রাখতে নিষেধ করেন। ১৭ জন রোযাদারের পেটের রস পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, যাদের পাকস্থলীতে এসিড খুব বেশি বা খুব কম, রোযার পরে তাদের এই উভয় দোষই সেরে গেছে। এই গবেষণায় আরও প্রমাণিত হয় যে, যারা মনে করেন যে, রোযার দ্বারা রক্তের পটাশিয়াম কমে যায় এবং তাদের শরীরের ক্ষতি সাধন হয়, তাদের এই ধারণা ও অমূলক। কারণ পটাশিয়াম কমার প্রতিক্রিয়া কম দেখা দিয়ে থাকে হৃদপিন্ডের উপর। অথচ ১১ জন রোযাদারের হৃদপিন্ড অত্যাধুনিক ইলেক্ট্রোকার্ডিগ্রাম যন্ত্রের সাহায্যে ( রোযার পূর্বেও রোযা রাখার ২৫ দিন পর) পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, রোযা দ্বারা এদের হৃদপিন্ডের ক্রিয়ার কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি।

সুতরাং বুঝা গেল যে, রোযা দ্বারা রক্তের যে পটাশিয়াম কমে তা অতি সামান্য স্বাভাবিক সীমারেখার মধ্যে। তবে রোযা দ্বারা যে কোন মানুষ কিছুটা খিটখিটে মেজাজ হয়ে যায়। তা রক্ত শর্করা কমার দরুনই যা স্বাস্থ্যের পক্ষে মোটেই ক্ষতিকর নয়। অন্য সময় ক্ষুধা পেলেও এরূপ হয়ে থাকে। (চিকিৎসা বিজ্ঞানে যুগের দান)

এক কথায় রোযা মানব শরীরের কোন ক্ষতি সাধন করে না। বরং তা নানাবিধ উপকারই করে থাকে। এছাড়া সফরের মুসাফিরকে এবং যুদ্ধের ময়দানে সেনানীকে পানাহার কষ্ট সহ্য করতে অভ্যস্ত করে তোলে এবং নাজ নেয়ামতে ডুবন্ত বড়লোকদিগকে অনাহারক্লিষ্ট দীন দরিদ্রের ক্ষুৎপিপাসা কষ্ট উপলদ্ধি করতে সহায়তা করে।

আল্লাহ তা'আলা সকলকে এখলাছ ও মহব্বতের সহিত রোযা রাখার তৌফিক ও শক্তি দান করুন। আমীন।।

তথ্যসূত্র: বিভিন্ন ইসলামী গ্রন্থ ও ব্লগ।

 

ইউটিউবে দেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় সব নাটক ও অনুষ্ঠান দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Desh TV YouTube Channel

এছাড়াও রয়েছে

‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত আরাফাত ময়দান

শওয়াল মাসের ছয় রোজার গুরুত্ব ও ফজিলত

আজ পবিত্র লাইলাতুল কদর

পবিত্র শবে কদরের ছুটি পুনঃনির্ধারণ

সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব করা হয়েছে

স্বাস্থ্যকর ইফতার

রমজানে সুস্থ থাকতে যে কাজগুলো করবেন

রমযান মাসে বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত

দুই জঙ্গি আস্তানায় অভিযান, নিহত ২

ভেঙে গেল ২০ দলীয় জোট

মতবিরোধ থাকলেও নির্বাচন পরিচালনায় ব্যত্যয় ঘটবে না: সিইসি

প্রেস কাউন্সিল শক্তিশালী করতে আইন সংশোধন: ইনু