আন্তর্জাতিক

ksrm

বুধবার, ১৮ জুলাই, ২০১৮ (১০:৫৯)

আফ্রিকার মানুষের জন্য আমি আমার জীবন উৎসর্গ করেছি: ম্যান্ডেলা

নেলসন ম্যান্ডেলা

আফ্রিকার মানুষের লড়াইয়ের জন্য আমি আমার এই পুরো জীবন উৎসর্গ করেছি। আমি শ্বেতাঙ্গ কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়েছি, লড়েছি কৃষ্ণাঙ্গ কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধেও। আমি সেই গণতান্ত্রিক ও মুক্ত সমাজের জয়গান গেয়েছি, যেখানে সবাই সমান সুযোগ নিয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে একসঙ্গে থাকবে। এটা এমন এক আদর্শ, যা আমি অর্জন করতে চাই, যার জন্য বাঁচতে চাই আমি। কিন্তু যদি প্রয়োজন হয়, এটি সেই আদর্শ, যার জন্য আমি মরতেও প্রস্তুত। বলেলেন নেলসন ম্যান্ডেলা।

১৯৬৩ সাল। জোহানেসবার্গের রিভোনিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) ১০ নেতাকে। তাঁদের বিরুদ্ধে আনা হয় বিদেশি যোগসাজশে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র, কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ। এই মামলার বিচার কার্যক্রম রিভোনিয়া ট্রায়াল নামে পরিচিত, যা ইতিহাসে ভাস্বর হয়ে আছে আদালতে দেওয়া নেলসন ম্যান্ডেলার তিন ঘণ্টা দীর্ঘ ভাষণের জন্য।

রিভোনিয়ায় গ্রেপ্তার ১০ এএনসি নেতার মধ্যে নেলসন ম্যান্ডেলা ছিলেন না। ১৯৬২ সালে অনুরূপ একটি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া মাদিবা তখন পাঁচ বছরের কারাদণ্ডাদেশ কাটাচ্ছেন। রিভোনিয়া বিচার শুরু হয় ১৯৬৪ সালে।

ম্যান্ডেলাসহ অন্য অভিযুক্তরা সিদ্ধান্ত নিলেন, আদালতে যুক্তিতর্কে অংশগ্রহণের বদলে তাঁরা একটি বক্তব্য উপস্থাপন করবেন, যেখানে তাঁদের আদর্শের কথা থাকবে, থাকবে কৃষ্ণাঙ্গদের আন্দোলনের কথা, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের সহিংস হয়ে ওঠার কার্যকারণ ও ব্যাখ্যা; আর থাকবে বর্ণবাদী সমাজকে একটি গণতান্ত্রিক ও সাম্যের সমাজে রূপান্তরের সুউচ্চ স্বপ্নের কথা। তাঁরা এই পথ বেছে নিলেন, কারণ তাঁরা জানতেন এই বিচার একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র, একটি সম্মতি উৎপাদনের হাতিয়ার কেবল, যা দিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের নেতাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়ে, তাঁদের কপালে সন্ত্রাসের অপবাদ লেপে দিয়ে পুরো মুক্তির আন্দোলনকেই দমিয়ে দেওয়া যাবে।

তিন ঘণ্টাব্যাপী বক্তব্যের শুরুতেই নিজের অবস্থান ও পরিচয় সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন এই কিংবদন্তি নেতা। বক্তব্য শুরু করেন তিনি, ‘আমিই প্রথম অভিযুক্ত’, বলে। এর পর তিনি তুলে ধরেন নিজের পরিচয়। ১৯৬৪ সালের ২০ এপ্রিল প্রিটোরিয়া সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে মাদিবা বললেন, ‘আমি একজন স্নাতক। অলিভার ট্যাম্বোর সঙ্গে যৌথভাবে জোহানেসবার্গে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছি কয়েক বছর। অনুমতি ছাড়া দেশত্যাগ ও ১৯৬১ সালের মে মাসের শেষ দিকে ধর্মঘটে যোগ দিতে মানুষকে প্ররোচিত করার দায়ে পাঁচ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত একজন কয়েদি আমি।’

এরপর তিনি তুলে ধরেন নিজের বিরুদ্ধে আনা নতুন অভিযোগ ও তার যৌক্তিক ভিত্তির বিষয়টি। রাষ্ট্রের দাবি ছিল, দক্ষিণ আফ্রিকায় ম্যান্ডেলাসহ অন্য অভিযুক্তদের তৎপরতার পেছনে বিদেশি মদদ অথবা কমিউনিস্ট প্রভাব রয়েছে। শুরুতেই এই অভিযোগ পুরোপুরি ‘অসত্য’ উল্লেখ করে ম্যান্ডেলা বলেন, ‘আমি যা করেছি, তা একজন ব্যক্তি ও নেতা হিসেবে আমিই করেছি। দক্ষিণ আফ্রিকায় আমার অভিজ্ঞতা এবং নিজের অনুভূত গৌরবজনক আফ্রিকান অতীতের ওপর দাঁড়িয়েই আমি এটা করেছি, কোনো বহিরাগতের কথায় নয়।’

তাহলে কী অনুপ্রাণিত করেছিল ম্যান্ডেলাকে এই মুক্তির আন্দোলনে? হ্যাঁ এই প্রশ্নেরও মীমাংসা করেছেন তিনি। বিদেশি কিংবা কমিউনিস্ট প্রভাব অস্বীকারের সঙ্গে সঙ্গে তিনি উচ্চারণ করেছেন সেই সব আফ্রিকান নেতার নাম, যাঁরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন, যাঁরা জীবন দিয়েছিলেন স্বাধীনতা ও মুক্তির আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে। মাদিবা বলেন, ‘ছোট থেকেই আমি স্বপ্ন দেখতাম তাঁদের মতো হওয়ার। আর এই সবই আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে তা করতে, যার জন্য আজকে আমার বিরুদ্ধে এই মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে।’

ম্যান্ডেলার সেদিনের দেওয়া ভাষণের এটুকু অংশকে বলা যায় উপক্রমণিকা। কারণ এরপরই তিনি সরাসরি প্রবেশ করেন তাঁর বিরুদ্ধে আনা সহিংসতার অভিযোগ খণ্ডনের দিকে। না তিনি আর সবার মতো সরাসরি এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেননি। তিনি এই পর্যায়টিকে বেছে নেন তাঁর তথা এএনসির আদর্শ প্রচার ও রাষ্ট্রের নিপীড়ক চরিত্র উন্মোচনের হাতিয়ার হিসেবে। তিনি বলেন, ‘সহিংসতার প্রশ্নে আমাকে বলতেই হয় যে, আদালতে এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে যা বলা হয়েছে, তার কিছু সত্য কিছু অসত্য। অস্বীকার করব না যে, অন্তর্ঘাতমূলক কাজের পরিকল্পনা করেছিলাম আমি। সহিংসতার প্রতি ভালোবাসা কিংবা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা থেকে এই পরিকল্পনা করিনি আমি। বহু বছর ধরে অপশাসন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও আমার লোকেদের ওপর চলা শ্বেতাঙ্গদের নিপীড়নের মধ্য দিয়ে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত ও সংযমের সঙ্গে বিশ্লেষণের পরই আমি এই পরিকল্পনা করেছি।’

বক্তব্যে তিনি এএনসির সশস্ত্র শাখা উমখনটো উই সিজউই প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হিসেবে নিজের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘১৯৬২ সালের আগস্টে গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত এই সশস্ত্র সংগঠনটির যাবতীয় কার্যক্রমের সঙ্গে আমি জোরালোভাবে যুক্ত ছিলাম।’ বক্তব্যের এই অংশে তিনি এএনসি ও উমখনটোর মধ্যে সম্পর্ক, কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে এর সংশ্লেষসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে তুলে ধরেন উমখনটোর এ ধরনের কৌশল বেছে নেওয়ার কারণ। রাষ্ট্রের দিক থেকে এক পাক্ষিক অভিযোগ খণ্ডনের ক্ষেত্রে এর চেয়ে কার্যকর আর কোনো কৌশল হতে পারে না। স্পষ্টভাবেই তিনি বলেন, ‘উমখনটো কী অর্জন করতে চায়, এই অর্জনের পথ হিসেবে তারা কী ঠিক করেছে এবং কেনইবা করেছে তার সবই আমি ব্যাখ্যা করব।’

সমর্থকদের সঙ্গে ম্যান্ডেলা। মানুষের জন্যই সাড়া জীবন লড়াই করেছেন তিনি। ছবি: এএফপিসমর্থকদের সঙ্গে ম্যান্ডেলা। মানুষের জন্যই সাড়া জীবন লড়াই করেছেন তিনি। ছবি: এএফপিএরপরই তিনি উমখনটোর বিরুদ্ধে আনা কিছু অভিযোগ ‘মিথ্যা’ বলে উল্লেখ করেন। এই পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যেই বলেছি, উমখনটো প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করা ব্যক্তিদের একজন আমি। এটি আমরা করেছিলাম দুটি কারণে। প্রথমত, আমরা বিশ্বাস করি যে, সরকারি নীতির কারণেই আফ্রিকার মানুষের মধ্যে সহিংস প্রবণতা অনিবার্য হয়ে উঠছে। এ কারণে যথাযথ নেতৃত্বের মাধ্যমে আমাদের মানুষদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রশমন করা না গেলে সংঘাত ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়বে, যা বিভিন্ন জাতির মধ্যে বৈরিতা এমন মাত্রায় নিয়ে যাবে, যা এমনকি যুদ্ধের মাধ্যমেও সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, আমাদের মনে হয়েছে, সংঘাত ছাড়া শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে আফ্রিকান মানুষের লড়াইয়ে সফল হওয়ার আর কোনো পথ খোলা নেই। (কারণ) এই আধিপত্যের বিরুদ্ধে মত প্রকাশের সব আইনি পথ আইনের দ্বারাই রুদ্ধ করা হয়েছিল। আর আমাদের এমন এক অবস্থানের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যেখানে হয় আমাদের হীনমন্যতার স্থায়ী বোধকে স্বীকার করতে হবে, নয়তো সরকারকে অস্বীকার করতে হবে। আমরা আইন অস্বীকারকেই পথ হিসেবে বেছে নিয়েছি। আমরা প্রথমে সহিংসতার পথ এড়িয়ে আইন অমান্য করেছি। কিন্তু যখন সরকার শক্তি দিয়ে বিরুদ্ধ মত দমনের পথ বেছে নিল, তখনই শুধু আমরা সহিংসতা দিয়ে সহিংসতা মোকাবিলার পথ বেছে নিলাম। কিন্তু আমাদের বেছে নেওয়া সহিংসতার পথ সন্ত্রাসবাদ নয়। আমরা যাঁরা উমখনটো প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, তাদের সবাই ছিলাম এএনসির সদস্য। আমাদের পেছনে ছিল রাজনৈতিক বিবাদ নিরসনে এএনসির আলোচনা ও অহিংস নীতির ঐতিহ্য। আমরা মনে করি যে, দক্ষিণ আফ্রিকা সবার, কোনো একক গোষ্ঠীর নয়, সে কালোই হোক আর সাদা। আমরা কোনো বর্ণবাদী যুদ্ধ চাইনি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা এটি এড়াতে চেয়েছি।’

এই বক্তব্যের বিষয়ে আদালতের কোনো সংশয় থাকলে তারা এএনসির ইতিহাস ঘেঁটে দেখতে পারে জানিয়ে ম্যান্ডেলা নিজেই এএনসির প্রতিষ্ঠা থেকে এর লড়াইয়ের সারমর্ম তুলে ধরেন। শ্বেতাঙ্গ পরিবেষ্টিত সেই আদালতে দাঁড়িয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা বলা যায় তুলে ধরেন কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। ১৯১২ সালে এএনসির প্রতিষ্ঠার সময় থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত এএনসির সংগ্রামের এত সংক্ষেপ ও কার্যকর বর্ণনা আর হতে পারে না। এই বর্ণনায় তিনি তুলে ধরেন ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত এএনসির নিষ্ফলা সাংবিধানিক লড়াইয়ের কথা, যেখানে এএনসি আস্থা রেখেছিল বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে সরকারের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আলোচনায়। কিন্তু এ পন্থায় যে কোনোই কাজ হয়নি, তা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি এএনসির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও নোবেল বিজয়ী শান্তিবাদী নেতা চিফ লুটুলিকে উদ্ধৃত করেন।

চিফ লুটুলি বলেছিলেন, ‘কে অস্বীকার করবে যে, বন্ধ দরজায় ভদ্রভাবে সংযম ও ধৈর্যের সঙ্গে কড়া নেড়ে নেড়েই আমার জীবনের ৩০টি নিষ্ফলা বছর কেটে গেছে? সংযমের মূল্য হিসেবে কী পাওয়া গেল? গত তিরিশটি বছর সাক্ষ্য দিচ্ছে অগণিত আইনের, যা প্রণয়ন করা হয়েছিল আমাদের অধিকার ও উন্নয়ন বঞ্চিত করার লক্ষ্যে, যার পথ ধরে আমরা আজ এমন একপর্যায়ে উপনীত হয়েছে, যখন আমাদের কোনো অধিকারই নেই।’

এই দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাসে দাঁড়িয়েও এএনসি শান্তিপূর্ণ পথেই আস্থা রেখেছিল। ম্যান্ডেলা বলেন, ‘এমনকি ১৯৪৯ সালের পরও সহিংসতার পথ এড়িয়ে চলার বিষয়ে এএনসি বদ্ধপরিকর ছিল। যদিও এই পর্যায়ে আন্দোলনে সাংবিধানিক পথ অনুসরণের কঠোর নীতি থেকে সরে আসে এএনসি।’

এই পর্যায়ে এএনসি শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে, যেখানে ম্যান্ডেলা ছিলেন স্বেচ্ছাসেবকদের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ব্যাপক সাড়া পড়ে এই আন্দোলনে। এএনসির আহ্বানে সাড়া দিয়ে বৈষম্যমূলক আইন অমান্য করে সাড়ে আট হাজারের বেশি মানুষ স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেন। কোনো ধরনের সহিংসতার ঘটনা না ঘটলেও এই আন্দোলনের কারণে ম্যান্ডেলাসহ ১০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। কিন্তু নেতাদের দণ্ড দিলে আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পারে, এই বিবেচনায় তাঁদের কোনো শাস্তি দেওয়া থেকে বিরত থাকেন আদালত। এই সময়েই এএনসির স্বেচ্ছাসেবক অংশটি গড়ে ওঠে, যাঁরা ছিল কিছু সুনির্দিষ্ট আদর্শ ধারণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ১৯৬৪ সালের মামলার অভিযোগপত্রে এই স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়েও মিথ্যাচার করা হয়। ম্যান্ডেলার ভাষায়, ‘স্বেচ্ছাসেবকদের ও তাদের করা অঙ্গীকারের বিষয়ে এই মামলায় যেসব প্রমাণ হাজির করা হয়েছে, তা ভিত্তিহীন। এই স্বেচ্ছাসেবকেরা শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধ করার জন্য তৈরি এমন কোনো কৃষ্ণাঙ্গ সেনাবাহিনীর সৈনিক আগেও ছিল না, এখনো নয়।’

আইন অমান্য আন্দোলনের সময়ই দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার জননিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করে। পাশাপাশি ফৌজদারি আইনে সংশোধনী এনে তাকে আরও কঠোর করা হয়। কিন্তু তারপরও এএনসি শান্তির পথ থেকে বিচ্যুত হয়নি। ১৯৫৬ সালে ম্যান্ডেলাসহ এএনসির ১৫৬ নেতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও কমিউনিজম দমন আইনে অভিযোগ আনা হয়। ওই মামলায় রাষ্ট্র এএনসির অহিংস নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ বছর চলা মামলার শেষে আদালতের দেওয়া রায়ে এএনসির বিরুদ্ধে সহিংসতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। সবাইকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়। এমনকি সরকার উৎখাত করে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় সবাইকে। সেই দ্বিমেরু বিশ্বকাঠামোয় দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার ইউরোপের দেশগুলোকে তুষ্ট করতে বরাবরই নিজের বিরোধী পক্ষের গায়ে কমিউনিস্ট তকমা সেঁটে দিতে সদা তৎপর থাকত। ১৯৬৪ সালের মামলাতেও একই কাজ করা হয়েছিল। আদালতে এমন অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে ম্যান্ডেলা বলেন, ‘এএনসি কখনোই কমিউনিস্ট সংগঠন ছিল না, আজও নয়।’ তবে কিছু ইস্যুতে কমিউনিস্টদের সঙ্গে একযোগে কাজ করার কথা স্বীকার করেন তিনি।

রোবেন দ্বীপের সেই কারা প্রকোষ্ঠের সামনে মুক্ত ম্যান্ডেলা। ছবি: রয়টার্সরোবেন দ্বীপের সেই কারা প্রকোষ্ঠের সামনে মুক্ত ম্যান্ডেলা। ছবি: রয়টার্সসেদিনের ঐতিহাসিক বক্তব্যে মাদিবা ১৯৬০ সালে এএনসি নিষিদ্ধ হওয়ার পর গোপনে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘আফ্রিকান মানুষ সরকারের অংশ নয়। যে আইন তাদের শাসন করছে, সে আইন তারা তৈরি করেনি। ফলে আমাদের কাছে এই নিষেধাজ্ঞাকে মান্য করার অর্থ ছিল আফ্রিকানদের কণ্ঠ চিরতরে রুদ্ধ করায় সম্মতি প্রদানের নামান্তর।’

একই বছর অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলের ওপর ভিত্তি করে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়। অথচ সাংবিধানিক এই পরিবর্তনের বিষয়ে কোনো আফ্রিকানের মতামত চাওয়া হয়নি। মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭০ শতাংশকে এই গণভোটে অগ্রাহ্য করা হয়। এর প্রতিবাদে এক সর্বদলীয় সম্মেলন আহ্বান করা হয়, যেখানে দল-মত নির্বিশেষে বিপুলসংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ যোগ দেয়। গণভোট বয়কট করতে এএনসির পক্ষ থেকে ‘ঘরে থাকা কর্মসূচি’ ঘোষণা করা হয়, যার সংগঠক ছিলেন মাদিবা স্বয়ং। কিন্তু তৎকালীন দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার সশস্ত্র বাহিনী নামিয়ে অহিংস এই কর্মসূচির সহিংস প্রত্যুত্তর দিল। এই ঘটনাকে মাদিবা তাঁর বক্তব্যে ‘ঐতিহাসিক’ ও উমখনটো গঠনের ‘প্রধান কারণ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

উমখনটো গঠনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে আদালতে দাঁড়িয়ে মাদিবা ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা ও সংঘাতময় রাজনীতির বিবরণ তুলে ধরে সরকারের গৃহীত নীতিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করান। তিনি বলেন, ‘১৯৬১ সালের জুনে দক্ষিণ আফ্রিকার পরিস্থিতির দীর্ঘ পর্যালোচনার পর আমি ও আমার সহযোদ্ধারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম যে, যেহেতু এই দেশে সহিংসতা অনিবার্য হয়ে উঠেছে, আমাদের সব শান্তিপূর্ণ দাবি যখন শক্তি দ্বারা দমনের নীতি নিয়েছে সরকার, সেহেতু শান্তি ও অহিংসার নীতি প্রচার করাটা এই মুহূর্তে আফ্রিকার নেতাদের জন্য অবাস্তব ও ভুল নীতি হবে। ...এমন নয় যে, আমরাই এটা চেয়েছিলাম। বরং সরকারই আমাদের সামনে এটি ছাড়া আর কোনো বিকল্প রাখেনি।’

উমখনটো গঠন করা হয় ১৯৬১ সালে। ওই বছরের ডিসেম্বরে এএনসির এই সশস্ত্র শাখার মেনিফেস্টো প্রকাশ করা হয়। সেই মেনিফেস্টোতেও অহিংস নীতিকেই সবচেয়ে বেশি সমর্থনযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রয়োজনে ‘যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রিত সহিংস কার্যক্রমের’ প্রতি অনুমোদন দেওয়া হয় এই ঘোষণাপত্রে। এই পদক্ষেপের পেছনেও ছিল শান্তির প্রত্যাশা। এএনসি দেখেছিল যে, দক্ষিণ আফ্রিকার পরিস্থিতি ক্রমেই গৃহযুদ্ধের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এটা চলতে দিলে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে এক সর্বব্যাপী বর্ণবাদী যুদ্ধ শুরু হতে পারে, যা কখনোই এএনসির লক্ষ্য নয়। বরং একটি বর্ণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল এএনসির লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে এএনসি সহিংসতার চারটি সম্ভাব্য ধারা বিশ্লেষণ করে শেষ পর্যন্ত অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতাকে নিজেদের নীতি হিসেবে গ্রহণ করে; কারণ এই নীতি প্রাণহানিকে সমর্থন করে না। বাকি তিনটি বিকল্পের মধ্যে ছিল গেরিলা যুদ্ধ, সন্ত্রাসী তৎপরতা ও সর্বাত্মক বিপ্লব। গৃহীত নীতি অনুযায়ী রেল, বন্দরসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা, বর্ণবাদী চিহ্নবাহী বিভিন্ন ভবন ইত্যাদিতে হামলার পরিকল্পনা নেয় উমখনটো। উদ্দেশ্য এভাবে সরকার ও তার সমর্থক গোষ্ঠী তাদের নীতির ত্রুটি শনাক্তে তৎপর হবে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে সংক্ষুব্ধ কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর আত্মবিশ্বাসের পালে জোর হাওয়া দেওয়া সম্ভব হবে, যা তাদের মুক্তির পথে সংগঠিতভাবে এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে। এতে কৃষ্ণাঙ্গরা উদ্দীপ্ত হলেও শ্বেতাঙ্গদের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া আসেনি। ম্যান্ডেলার ভাষায়, ‘এই পরিস্থিতি আমাদের আরও বেশি শঙ্কিত করে তুলল। এভাবে পৃথক ডেরায় অবস্থান নিলে গৃহযুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হবে কীভাবে? কীভাবে আফ্রিকানদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব হবে?’

আদালতে দাঁড়িয়ে ম্যান্ডেলা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি অধ্যায় নিয়ে কথা বলেছেন। এএনসির প্রতিষ্ঠাকাল থেকে উমখনটো প্রতিষ্ঠার কার্যকারণ ব্যাখ্যার পাশাপাশি পরবর্তী সম্ভাব্য কর্মসূচি হিসেবে এএনসি যে গেরিলা যুদ্ধের কথাও ভেবেছে, তারও উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি এএনসির প্রতি পুরো আফ্রিকা অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ ও ব্রিটিশ রাজনীতিক গেইটসকেল ও গ্রিমন্ডের অকুণ্ঠ সমর্থনের কথাও। কথা হচ্ছে এই সব তিনি কী কারণে এতটা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরলেন? আদালতে তিনি ও তাঁর সহঅভিযুক্তরা শুধু নিজেদের আত্মপক্ষ সমর্থন করলেই পারতেন। এটিই বরং তাঁদের আইনি সুরক্ষা দিতে পারত বেশি। কিন্তু ম্যান্ডেলা, ভবিষ্যৎ আফ্রিকার মাদিবা সেই পথে হাঁটলেন না। তিনি বরং আদালতে কথা বলার সুযোগটি নিতে চাইলেন, যার মাধ্যমে তিনি তখনকার দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের নিপীড়ক চরিত্র উন্মোচনের পাশাপাশি একটি বর্ণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে ছড়িয়ে দেবেন।

ওই দিনের বক্তব্যে মাদিবা পুরো আফ্রিকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিত্রও তিনি তুলে ধরেন। শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য এবং এই বৈষম্য টিকিয়ে রাখতে প্রণীত বিভিন্ন আইনের উল্লেখ করে তিনি শেষ পর্যন্ত ‘শ্রেণিহীন সমাজ’-এর প্রতি নিজের পক্ষপাতের কথা তুলে ধরেন। তিন ঘণ্টার এই বক্তব্যে কার্ল মার্কসের প্রসঙ্গ এসেছে। এসেছে মহাত্মা গান্ধীসহ বিশ্বের অন্যান্য মহান নেতার কথা। ছিল ম্যাগনা কার্টাসহ গণতন্ত্রের সনদগুলোর উল্লেখ। অনেকটা বিদায়ী ভাষণের মতো করে দেওয়া সেই বক্তব্যের শেষ অংশটি ছিল সর্বতোভাবেই ঐতিহাসিক।

বক্তব্যের একেবারে শেষে এসে মাদিবা বললেন, ‘আফ্রিকার মানুষের লড়াইয়ের জন্য আমি আমার এই পুরো জীবন উৎসর্গ করেছি। আমি শ্বেতাঙ্গ কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়েছি, লড়েছি কৃষ্ণাঙ্গ কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধেও। আমি সেই গণতান্ত্রিক ও মুক্ত সমাজের জয়গান গেয়েছি, যেখানে সবাই সমান সুযোগ নিয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে একসঙ্গে থাকবে। এটা এমন এক আদর্শ, যা আমি অর্জন করতে চাই, যার জন্য বাঁচতে চাই আমি। কিন্তু যদি প্রয়োজন হয়, এটি সেই আদর্শ, যার জন্য আমি মরতেও প্রস্তুত।’

এই বিচার শুরুর আগেই গুঞ্জন ছিল যে, অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে। কিন্তু নেলসন ম্যান্ডেলার এই ভাষণে এমন কিছু ইঙ্গিত ছিল, যা শাসকগোষ্ঠীকে এমন পদক্ষেপ নিতে বারিত করেছে। ফলে সরকারি কৌঁসুলি আদালতে এমনকি অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি শোনানোর আবেদনও করেননি। শেষ পর্যন্ত আদালত নেলসন ম্যান্ডেলাসহ অন্য অভিযুক্তদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা শুনিয়েছিল।

 

ইউটিউবে দেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় সব নাটক ও অনুষ্ঠান দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Desh TV YouTube Channel

এছাড়াও রয়েছে

কেরালায় বন্যা-ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫৭ জনে

হজ পালনের অনুমতি পায়নি কাতারের নাগরিক

রোহিঙ্গা নির্যাতন: মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় মিয়ানমারের দুটো সামরিক ইউনিট

পাক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন ইমরান খান

প্রথমবারের মতো উত্তর মেরুতে বোমারু বিমান পাঠালো রাশিয়া

ভারতে বন্যা-ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৮৫০

কফি আনান আর নেই

কেরালায় বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১০৬

'মিয়ানমার নাগরিক' শব্দটি বাদ দিতে বলেছে

নাটোরে কৃষক হত্যায় পাঁচ জনের ফাঁসি

জামিন পেল ২৫ শিক্ষার্থী

বরাদ্দকৃত চাল চুরির অভিযোগে দিনাজপুরে পৌর মেয়র গ্রেপ্তার